মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত গভীর হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। মূল্য ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ার পর, শুক্রবার (২০ মার্চ) তা সামান্য কমেছে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ থাকায় তেলের দাম চড়া থাকবে।
গোল্ডম্যান স্যাকস এমনকি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই উচ্চমূল্য ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বিনিয়োগ ব্যাংকটির বিশ্লেষকরা বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) এক নোটে লিখেছেন, ‘পূর্ববর্তী বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতিগুলোর স্থায়িত্ব এটিই নির্দেশ করে যে, দীর্ঘমেয়াদী বিঘ্ন এবং বড় ধরনের ক্ষতির ক্ষেত্রে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরেই থেকে যেতে পারে।’
শুক্রবার (২০ মার্চ) ভোরে বৈশ্বিক তেলের মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমে ১০৮ ডলারে এবং মার্কিন মানদণ্ড ‘ডব্লিউটিআই’ ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৯৪ দশমিক ৬ ডলারে নেমেছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন জানালেন যে তারা ইরানের প্রধান জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে পুনরায় হামলা না চালানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেবে, তখন তেলের দাম কিছুটা থিতু হয়।
উল্লেখ্য, ইরানের ‘সাউথ পার্স’ ফিল্ডে ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্র কাতারের ‘রাস লাফান’-এ পাল্টা হামলা চালালে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়েছিল।
আড়াই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ গ্যাস বা জ্বালানি মূল্যের সম্মুখীন হওয়া মার্কিনিদের আশ্বস্ত করে ট্রাম্প বলেছেন, এটি খুব শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে।
তিনি আরও যোগ করেন যে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে তিনি ভেবেছিলেন পরিস্থিতি ‘আরও খারাপ’ হবে।
তবে তিন সপ্তাহ পার হলেও এই সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই। শুক্রবার ভোরেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার খবর দিয়েছে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি টানা ১৯ দিন ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ আটকে দিয়েছে।
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার বলেছেন যে, এই প্রণালি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না। তিনি আগের সেই হুমকির পুনরাবৃত্তি করেন যে, ইরান আক্রান্ত হলে এই জলপথ বিঘ্নিত হবে।
টানা তিন সপ্তাহ প্রণালিটি প্রায় অবরুদ্ধ থাকায়—যা ইতিহাসে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে—গোল্ডম্যান স্যাকস আশঙ্কা করছে তেলের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা সতর্ক করেছে যে, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ব্যারেল প্রতি ১৪৭ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি ধারণা করছে যে, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ দুই মাসের বেশি সময় ধরে অত্যন্ত কম থাকে এবং পুনরায় খোলার পর উৎপাদন দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১১১ ডলারের আশেপাশে থাকবে।
অন্যদিকে, গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে তুলনামূলক ইতিবাচক পরিস্থিতি হতে পারে যদি এপ্রিল থেকে প্রণালি দিয়ে তেলের প্রবাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। সেক্ষেত্রে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭০ ডলারের ঘরে নেমে আসতে পারে। তবে এই সপ্তাহে জ্বালানি অবকাঠামোতে হওয়া হামলাগুলো দীর্ঘমেয়াদী মূল্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইতোমধ্যেই রাস লাফান-এর পরিচালনাকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’ জানিয়েছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে দেশটির এলএনজি রপ্তানি ক্ষমতা ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং এটি মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, যা ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে সরবরাহে প্রভাব ফেলবে।
সূত্র: সিএনএন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


