Advertisement
কুরবানির ঈদের আগে আর কোনো কর্মদিবস নেই। অফিস-আদালত ছুটি হয়ে গেছে। বন্ধ রয়েছে মিল কারখানা। মাটির টানে ঘরে ফিরছে লাখো মানুষ। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার পুরোদমে শুরু হয়েছে কুরবানির পশু বিক্রি। জমে উঠেছে রাজধানীসহ সারা দেশের পশুর হাট। সকাল থেকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। দেশে পর্যাপ্ত কুরবানির পশু থাকায় ভারত থেকে গরু না আসলে বাড়তি লাভের আশায় বুক বেধেছেন গৃহস্থ ও বেপারিরা। এবার মাঝারি ও ছোট সাইজের গরুর কদর বেশি থাকলেও হাটে উট, দুম্বা, বড় গরু ও খাসির চারপাশে কৌত‚হলী মানুষের জটলা রয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে কাদাপানিতে হাটের ভেতরকার অবস্থা নাজুক। গতকাল শুক্রবার পশুর দাম বেশি বলে ক্রেতারা দাবি করলেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিক্রেতারা।

এদিকে অজ্ঞানপার্টি, মলম পার্টি, জালটাকার চক্র এবং ওষুধ খাইয়ে মোটাতাজা করা গরুর খোঁজে হাটে চলছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। হাট ঘিরে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ, আছে সিসিটিভিতে নজরদারি।

দেশের অন্যতম বৃহৎ গাবতলী পশুর হাটে ক্রেতা ‘কালা পাহাড়’, ‘ধলা পাহাড়’, ‘লাল পাহাড়’, ‘কালা মানিক’, ‘টনিরাজের’ চারপাশে ঘুরলেও সাড়া পাচ্ছেন না এসব গরু মালিক বিক্রেতারা। ছোট ও মাঝারি গরুতে আগ্রহ ক্রেতাদের। রাজধানীর আফতাবনগর ও কমলাপুর হাট দিনে পুরোদমে জমে না উঠলেও রাতে বিক্রি বাড়ার আশা ইজারাদারের। এই হাটের আকর্ষণ সাদা রঙের মহিষ সুন্দরী ও ১২০০ কেজি ওজনের বাহুবলী এবং বাহাদুর। আফতাবনগর হাটে রয়েছে লাখ টাকার ভেড়া। সৌদি আরব থেকে আনা এই ভেড়ার দল দেখতে হাটে ভিড় করছেন শত শত মানুষ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পাঁচ বছর আগেও কুরবানির ঈদে বৈধ-অবৈধ পথে ভারত, নেপাল ও মিয়ানমার থেকে ২০-২৫ লাখ গরু আমদানি করে দেশের চাহিদা পূরণ করা হতো। গত এক বছরে কুরবানির পশুর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন লাখ। এর মধ্যে গরুর উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার। আর ছাগল-ভেড়ার উৎপাদন বেড়েছে এক লাখ। গত বছর কুুরবানিতে দেশে পশু জবাই হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ। এর মধ্যে ছাগল-ভেড়া ছিল ৭১ লাখ এবং গরু-মহিষ ৪৪ লাখ। আর এবার দেশে কুরবানির পশু রয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ছাগল-ভেড়া ৭২ লাখ এবং গরু-মহিষ ৪৫ লাখ ৮৮ হাজার। এ ছাড়া সরকারি আটটি খামারে উট-দুম্বাসহ আরো সাত হাজার কুরবানির পশু রয়েছে।

বাংলাদেশ পশু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মজিবুর রহমান বলেন, ক্রেতা বেশি থাকলেও মাঝারি ও ছোট আকারের গরু চাহিদার তুলনায় কম। বড় গরুর আলাদা ক্রেতা রয়েছে। হাটে পর্যাপ্ত গরু ও খাসি রয়েছে। পথে যানজটে আটকে আছে কয়েক হাজার পশুভর্তি ট্রাক।
গাবতলী হাট গতকাল সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে ক্রেতা আসা বেড়েছে। ছোট আকারের, বিশেষ করে ৬৫ থেকে ৮৫ হাজার টাকা দামের গরু বিক্রি বেশি হচ্ছে। তবে বড় গরুর বেচাকেনা এখনো তেমন শুরু হয়নি। বিভিন্ন স্থান থেকে বেপারিদের পাশাপাশি গৃহস্থরাও এসেছে এই হাটে। এখনো শত শত ট্রাকে আসছে গরু। কুষ্টিয়া মেহেরপুর এলাকার মঞ্জুরুল ইসলামের তিনটা গরু সবার নজর কেড়েছে। ‘কালো পাহাড়’, ‘লাল পাহাড়’ ও ‘সাদা পাহাড়’-এই তিন গরুর দাম হাঁকানো হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। লাল পাহাড় ৮ লাখ, কালো পাহাড় ১৫ লাখ ও সাদা পাহাড় ১২ লাখ টাকা। লোকজন ঘুরে ঘুরে দেখলেও কাক্সিক্ষত দাম বলছেন না কেউ। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার

খোরশেদ আলম কালো মানিকের দাম চাচ্ছেন ৩০ লাখ টাকা। ১৮ লাখ পর্যন্ত দাম উঠলেও তিনি অনড়। তার আরেকটির গরুর নাম ‘টনিরাজ’, ২৫ লাখ টাকা চাওয়া হলেও এর দাম ওঠেনি এখনো। কুষ্টিয়া কুমারখালীর সুলতানের আশা কুরবানি ও ১৫ আগস্ট পাশাপাশি হওয়ায় পশু বিক্রি হবে বেশি। কুরবানিতে পশু তো বিক্রি হবেই। সঙ্গে ১৫ আগস্ট অনেক গরু জবাই হয়। সেজন্য এবার দাম পাওয়ার আশা থাকছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা জামাল উদ্দিন বেপারি ২৪টি ছোট গরু হাটে আনলে চারটা বিক্রি হয়েছে।
গতকাল থেকে হাটের অবস্থা ভালো হওয়ায় তিনি আশায় বুক বেধেছেন। কুষ্টিয়ার খোকসা থেকে আসা আমিরুল ইসলাম বেপারি ১৫টি গরুর মধ্যে ছয়টি গরু বিক্রি করেছেন। আমিরুল বলেন, ছোট গরুর বেচাকেনা ভালো। বিক্রি শুরু হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরের খামারি শহিদুল ইসলাম ১০৬টি গরুর মধ্যে ৩০টি বিক্রি করে বাকিগুলো বিক্রির অপেক্ষায় আছেন। বগুড়ার সান্তাহার থেকে আসা লিটন বেপারি ২১টি বড় গরু তুলে ক্রেতা তুষ্টির চেষ্টা করছেন। হাটে উট ও দুম্বার শেডে ক্রেতা না থাকলেও সেখানে দর্শনার্থীর ভিড়ের কমতি নেই। ছোট ও মাঝারি গরু ক্রেতারা দাবি করেছেন, কেনা শুরুর প্রথম দিন হওয়ায় দাম ছিল বেশি।

এদিকে জমে উঠেছে আফতাবনগর হাট। কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসানো হাটে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সাইজের গরু বাজারে আনা হলেও মাঝারি সাইজের গরুর সংখ্যা বেশি। খাসি ও পর্যাপ্ত ভেড়াও উঠেছে হাটে। অনেকে পরিবার নিয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসেছেন কুরবানির গরু কিনতে। পছন্দের গরু ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কেউ কেউ ভিড় করছেন ছাগল ও ভেড়ার সারিতে। এই হাটের আকর্ষণ লাখ টাকা দামের ভেড়া। পাবনার সুজানগরের জয় এগ্রো ফার্মের এই ভেড়া আট বছর আগে সৌদি আরব থেকে আনা। এর মাংস হবে ৬৫ কেজির উপরে। ফার্মের মালিকের ভাই আল আমিন বলেন, আমাদের ফার্মে একশর বেশি ভেড়া আছে। সেখান থেকে কয়েকটি ভেড়া আনা হয়েছে। তাদের সব ভেড়া সৌদি আরবের উন্নত জাতের বলে দাবি করেন আল আমিন। তিনি বলেন, ৮ বছর আগে পাঁঠা-ভেড়া সৌদি আরব থেকে আনা হয়। এর মাধ্যমেই এখনকার ভেড়ার জাতপত্তন। প্রাথমিকভাবে দাম চাওয়া হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে এক লাখের নিচে বিক্রি করার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানান তিনি। তার কাছে থাকা সব থেকে কম দামের ভেড়াটির দাম ৪৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৫০- ৬০ হাজার এবং ৮০ হাজার টাকার ভেড়া রয়েছে। ৩০ কেজি মাংস হবে এমন ভেড়া ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে। কিশোরগঞ্জ থেকে আফতাবনগরে এসেছে যুবরাজ। এটি ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড়, বয়স তিন বছর। গরুটির দাম হাঁকা হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। গরুটির ওজন ১২০০ কেজির উপরে। বিশাল আকারের এই দেহ নিয়ে যুবরাজকে নড়াচড়া করতে একটু কষ্ট হয়। যুবরাজকে নিয়ে আসা মো. সোহাগ বলেন, যুবরাজ আমাদের নিজস্ব গাভীর বাছুর। তিন বছর ধরে ওকে লালন-পালন করছি। শখ করে নাম রেখেছি যুবরাজ। যুবরাজের পেছনে ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থেকে ২৫টি দেশীয় বড় ও মাঝারি সাইজের গরু এনেছেন খোরশেদ আলি। তার সঙ্গে আরো ২ জন অংশীদার আছেন। গত সোমবার ২টি ট্রাকে করে গরুগুলো এখানে এনেছেন তারা। এরইমধ্যে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ৭টি গরু বিক্রি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিনভর বৃষ্টি থাকায় হাটে ক্রেতার উপস্থিতি কমের মধ্যেও সারা দিনে ৩টি গরু বিক্রি করেছেন তিনি। তার মতে বরাবরের মতো এবারো ক্রেতাদের চাহিদা দেশীয় মাঝারি গরুর প্রতি বেশি। ৭টি গরুর মধ্যে তিনি ২টি গরু ৭৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করেছেন। বাকিগুলো ৪৫ থেকে শুরু করে ৭০ হাজারের মধ্যে মূল্য ছিল। গতকাল রাতের মধ্যে ২০টি গরু বিক্রি হলে আজ শনিবার আরো ১৫/২০টি গরু আনার পরিকল্পনা আছে তার। দাম পেয়ে বিক্রেতারা সবাই খুশি।

কমলাপুর হাটের মূল আকর্ষণ এফ এন্ড এফ এগ্রো ফার্মের ফ্রিজিয়াম জাতের বাহুবলী ও অস্ট্রেলিয়ান জাতের বাহাদুর নামের দুই গরু। এ ছাড়াও রয়েছে থাইল্যান্ডের সাদা জাতের মহিষ সুন্দরী। তাদের ঘিরেই অনেক লোকের জটলা। এ ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. ফিরোজ হাসান অনিক ও মো. ফারুক হোসেন জানান, প্রায় ৫ বছর ধরে বাহুবলী ও বাহাদুরকে পালছেন তারা। দৈনিক ঘাস, ভুট্টা ও ভুসি মিলিয়ে প্রায় ২০ কেজি করে মোট ৪০ কেজি খাবার খাওয়ানো হয় এ দুটি পশুকে। এদের দুজনেরই গড়ে ওজন প্রায় ১২০০ কেজি করে। বাহুবলী ও বাহাদুরের দাম ২৪ লাখ টাকা চাইছেন তারা। এ ছাড়াও তাদের রয়েছে সুন্দরী নামে এক সাদা মহিষ। এটির দাম তারা চাইছেন ৪ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, কমলাপুর পশুর হাটে বেচাকেনা এখনো তেমনটা শুরু না হলেও হাটে ছোট-বড় মিলিয়ে কুরবানি পশুর কমতি নেই। তবে দাম চড়া। কুষ্টিয়ার গরুর বেপারি বজলুল হক জানান, ৬ ট্রাক গরু এনেছেন তারা। বন্যা ও গো-খাদ্যের কারণে দাম একটু বেশি। বেচাকেনা এখনো তেমন শুরু হয়নি। আজ থেকে বিক্রি বাড়বে।

এদিকে, বৃষ্টি ও পশুর বর্জের কারণে হাট সংলগ্ন এলাকাবাসী রয়েছেন ডেঙ্গু আতঙ্কে। স্থানীয়রা বলছেন, পানি ও নোংরা স্থানে ডেঙ্গু মশার লার্ভা জন্মে তাই তারা আতঙ্কিত। গোপীবাগ এলাকার বাসিন্দা পলাশ ও ফখরুল ইসলাম জানান, হাট সংলগ্ন বাসা তাদের। বৃষ্টির পানি ও গরুর বর্জ্য মিলে চলা দায়। ডেঙ্গু আতঙ্কে রয়েছেন তারা।

হাট কর্তৃপক্ষ বলছেন, সিটি করপোরেশনের নির্দেশনাসহ প্রসাশনিক সব নিয়ম মেনেই চলছে হাট। এ বিষয়ে হাটের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬ নাম্বার ওয়ার্ডের কমিশনার বি এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, গোপীবাগ, মানিকনগর, কমলাপুর বীর শ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম ও বালুর মাঠ এলাকা নিয়ে এ হাট। জালটাকা শনাক্তকারী মেশিন, পশু চিকিৎসক রয়েছে আমাদের। এ ছাড়াও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব ও পুলিশের ক্যাম্প বসানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গু মশা পানিতে হয়। তবে সিটি করপোরেশনের নির্দেশনানুযায়ী আমরা কাজ করছি। ৪০ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী ২৪ ঘণ্টা হাটের বর্জ্য অপসারণে কাজ করছে।

এদিকে, পশুর হাটকে ঘিরে টঙ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা রমরমা অবস্থা। এ বিষয়ে বালুর মাঠের টঙ দোকানদার মো. মিলন জানান, হাটকে ঘিরে ব্যবসা তাদের চাঙ্গা। দুই শিফট করে ২৪ ঘণ্টাই দোকান খোলা রাখছেন তারা। সূত্র : ভোরের কাগজ

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.