পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ংকর শিকারি প্রাণী কোনটি? অনেকেই হয়তো বলবেন বাঘ, সিংহ বা চিতার কথা। অনেকে আবার ডাইনোসরের কথাও বলে বসতে পারেন। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর শিকারি প্রাণীটিকে ভয় পেত ডাইনোসরেরাও। কিন্তু সে প্রাণী আজ আর নেই। বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই। বলছি সমুদ্রের সম্রাট মেগালোডনের কথা।
মেগালোডনের বৈজ্ঞানিক নাম ওটোডাস মেগালোডন (Otodus megalodon)। একে গ্রেট হোয়াইট শার্কের পূর্বপুরুষ বলা হয়। মায়োসিন থেকে প্লিওসিন যুগে এদের বাস ছিল পৃথিবীতে। মানে এখন থেকে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ বছর আগে এরা পৃথিবীর সমুদ্রে ছিল। লম্বায় ছিল প্রায় ৬০ ফুট। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মেগালোডন প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৩৪ কেজি খাবার খেত। ওজন ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৬৫ মেট্রিক টন (১ মেট্রিক টনে ১০০০ কেজি)।
মেগালোডনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল এর দাঁত। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ফসিল থেকে দেখা যায় যে, এদের দাঁতের আকার ছিল কমপক্ষে ৬.৯ ইঞ্চি। তবে কোনো কোনোটার দাঁতের আকার প্রায় আরও ৩ গুণ বড় হতো। একটি প্রাপ্তবয়স্ক মেগালোডনের ২৭৬টি দাঁত ছিল বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তবে এদের দাঁত ছিল ত্রিভুজাকৃতির। এই বৃহদাকার প্রাণীর খাবারের তালিকায় ছিল নানা প্রজাতির হাঙর ও বড় বড় সামুদ্রিক মাছ।
মেগালোডন পুরো পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। এরা উষ্ণ রক্তের প্রাণী। তাই সমুদ্রের গভীরেই ছিল চলাচল। বিশালাকার এই প্রাণীটির শিকার করার পদ্ধতিও ছিল আলাদা। মাছটি তার শরীরের সব ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে শিকারের কম্পন বোঝার চেষ্টা করত। নিজের শরীরের নাড়াচাড়ার মাধ্যমে বুঝতে পারত, শিকার কীভাবে কাবু করতে হবে। আর শিকারকে কাবু করতে ওর বিশালাকার দাঁত ও লম্বা শরীর তো আছেই।
এদের ইন্দ্রিয় এতই তীক্ষ্ণ ছিল যে কয়েক কিলোমিটার দূরের হালকা নড়াচড়াও অনুভব করতে পারত।তবে উষ্ণ রক্তের প্রাণী হওয়াটাই ওদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আজ থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে পৃথিবীর তাপমাত্রা হঠাৎ ঠান্ডা হতে শুরু করে। ফলে ওদের খাদ্যের পরিমাণ কমে যায়। আবার বরফ যুগ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রাণী মেরু অঞ্চলে চলে যায়। মেগালোডনের পক্ষে সেগুলোর পিছু নেওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ, শরীর উষ্ণ রাখতে উষ্ণ পানিতেই থাকতে হতো। তাছাড়া বরফ যুগের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রতলের উচ্চতা কমে যায়।
ফলে ওদের চারণক্ষেত্র কমে যেতে থাকে। এসময় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা দেয় খুনে তিমিসহ আরও কিছু শিকারি প্রাণী। সবকিছু মিলিয়ে ধীরে ধীরে মেগালোডন হারিয়ে যায় পৃথিবী থেকে। ওদের বিলুপ্তিতে জীবজগতে বেশ প্রভাব পড়ে। যেমন ওদের অনুপস্থিতির বালিন তিমিরা নিজেদের আকার বাড়িয়ে নিয়েছিল খুব দ্রুত।
কিন্তু হারিয়ে গিয়েও যেন রয়ে গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই মাছ। এখনো অনেকে মনে করেন, আজও সমুদ্রের অতলে কিছু মেগালোডন রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন একটি ঘটনার জন্য এ বিশ্বাস আরও বাড়তে থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে একদল গবেষক অজানা এই প্রাণীর গুজব শুনে সাগরের গভীরে অনুসন্ধান চালায়।
কিন্তু তারা আর ফিরে আসেনি। কয়েকদিন পর তাঁদের ভাঙা ক্যামেরা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত বোট পাওয়া গিয়েছে। বোটে একটা মাছের কামড়ের দাগ দেখা যায়, যা সাধারণ পরিচিত কোনো মাছের কামড় নয়। কোনো হাঙরের দাঁতের সঙ্গে তা মেলানো যায়নি। তবে সেই কামড় কীসের, সে সমাধান আজও হয়নি। তাহলে কী এখনো পৃথিবীতে আছে মেগালোডন। না। বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে, একসময় সাগর কাঁপিয়ে বেড়ানো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাছ সত্যিই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।