আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রে চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ স্বীকার করেছেন সিঙ্গাপুরের এক নাগরকি। বেইজিং-ওয়াশিংটন তীব্র উত্তেজনার মধ্যে এ ঘটনা ঘটলো।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জুন ওয়েই ইয়ো নামে সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তার রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে চীনের জন্য তথ্য সংগ্রহে ব্যবহার করতেন।
আলাদাভাবে, যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, চীনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক লুকানোর অভিযোগে এক চীনা গবেষককে আটক করেছে ওয়াশিংটন।
এরআগে, চেঙ্গডুতে থাকা মার্কিন কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দেয় বেইজিং।
টেক্সাসের হিউস্টনে থাকা চীনা কনস্যুলেট বন্ধে মার্কিন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন বন্ধ করে দেয় বেইজিং।
যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেন, চীন মেধাস্বত্ত্ব চুরি করছিল। তাই টেক্সাসের চীনা কনস্যুলেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে জগাখিচুড়ি মার্কা চীনবিরোধী মিথ্যাচার বলে অভিহিত করেছেন।
বেশ কয়েকটি মূল সমস্যার কারণে পরমাণু শক্তিধর দুই রাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন, বাণিজ্য এবং করোনা ভাইরাস মহামারি নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে অব্যাহতভাবে বিবাদে জড়াচ্ছে। চীনও হংকংয়ে বিতর্কিত নতুন নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন করেছে।
শুক্রবার মার্কিন বিচার বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, জুন ওয়েই ইয়ো যুক্তরাষ্ট্রে ডিকসন ইয়ে নামেও পরিচিত। শুক্রবার দেশটির একটি ফেডারেল আদালতে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চীনের অবৈধ এজেন্ট হিসেবে কাজ করার কথা স্বীকার করেছেন জুন ওয়েই।
এর আগে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে তিনি তার রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের মূল্যবান তথ্য চীনা গোয়েন্দাদের জন্য সংগ্রহ করতেন।
আদালতে, উচ্চমাত্রা নিরাপত্তার স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাদের দিয়ে ভুয়া মক্কেলদের জন্য প্রতিবেদন তৈরির বিষয় স্বীকার করেন জুন ওয়েই। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়।
আলাদা বিবৃতিতে চীনা গবেষক গ্রেফতারের বিষয়টি জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ৩৭ বছর বয়সী ওই গবেষকের নাম জুয়ান ত্যাং বলে জানিয়েছে।
ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে গেলো সপ্তাহে চার চীনা নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ওই নারী গবেষক রয়েছেন। চীনা সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগ রয়েছে আটককৃতদের বিরুদ্ধে। সানফ্রান্সিসকোর চীনা কনস্যুলেট জুয়ান তাংকে আশ্রয় দিয়েছে বলে অভিযোগ মার্কিন কর্তৃপক্ষের।
ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। তবে কীভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে তার বিস্তারিত জানা যায়নি।
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, চীনা সামরিক পোষাক পরা জুয়ান তাংয়ের একটি ছবি পায় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। পরে তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে ওই বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়ে নিশ্চিত হন গোয়েন্দারা।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাতে এপি আরো জানায়, জুয়ান ওই প্রতিষ্ঠানের ভিজিটিং রিসার্চার হিসেবে রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। জুনে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন বলেও জানানো হয়।
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বিবাদের বেশকিছু কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার জন্য চীনকে দায়ী করছেন। এ কাজটা বিশেষভাবে করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবি করে আসছেন, চীনের উহানের গবেষণাগার থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে।
মার্চে ট্রাম্পের অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, সম্ভবত মার্কিন সেনারা উহানে ভাইরাসটি নিয়ে এসেছিল।
২০১৮ সাল থেকে শুল্কযুদ্ধে জড়িত চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।
সংক্ষেপে চীন -যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব: ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, চীন অসৎভাবে বাণিজ্য করছে এবং বেইজিংকে মেধাস্বত্ব চোর বলে আখ্যা দেন তিনি। চীনের ধারণা, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান অবস্থানকে প্রতিরোধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এরকম করছে।
চীনা রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্তরা জিনজিয়ানে সংখ্যালঘু মুসলমানদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গণ-কারাগারে উইঘুরসহ সংখ্যালঘুদের আটকে রেখে ধর্মীয় নির্যাতন, জোরপূর্বক বন্ধ্যা করছে চীন।
অভিযোগ অস্বীকার করে চীন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগ চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভয়াবহ হস্তক্ষেপ।
হংকংয়ে নতুন নিরাপত্তা আইন: তড়িঘড়ি করে হংকংয়ে চীনা জাতীয় নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন বেইজিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত হংকং ব্রিটেনের প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল।
প্রতিবাদে, গেলো সপ্তাহে হংকংকে দেয়া বিশেষ বাণিজ্য মর্যাদা প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই বাণিজ্য সুবিধায় যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিতে চীনা পণ্যে আরোপিত শুল্ক এড়ানোর সুযোগ পেতো চীন।
১৯৮৪ সালে হংকংয়ের সার্বভৌমত্ব বিষয়ে চীন-যুক্তরাজ্যের মধ্যে চুক্তি সই হয়। ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ওয়াশিংটন ও লন্ডন বলছে, চুক্তিতে হংকংয়ের বাসিন্দাদের যে স্বাধীনতা দেয়া হয়, নতুন নিরাপত্তা আইনে তা হুমকিতে পড়বে।
ক্ষুব্ধ যুক্তরাজ্য, হংকংয়ের ৩০ লাখ বাসিন্দাকে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব দেয়ার ঘোষণা দেয়। হংকংয়ে বসবাসকারী যারা ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করেন, তাদের পাসপোর্ট বাতিলের হুমকি দিয়ে লন্ডনের প্রতিবাদের জবাব দেয় চীন।
সূত্র: বিবিসি। অনুবাদ: ফাইয়াজ আহমেদ
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


