রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ ঢাকা। আগামীকাল মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন।

রামিসা হত্যা

Advertisement

রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে, মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ, ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ রিপোর্ট ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তারা উভয় আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রধান আসামি সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্য আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট আইনে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড চেয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকাল ৯টার দিকে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে আনা হয়। পরে তাদের ঢাকা দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। মামলাটি কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং আদালতজুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

আদালত সূত্রে জানা যায়, বেলা ১১টা ২০ মিনিটে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে এবং বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে স্বপ্না আক্তারকে আদালতের এজলাসে তোলা হয়। বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। বেলা ১১টা ৪৪ মিনিটে বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে প্রবেশ করলে যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি: অভিযোগ নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণিত, তাই মৃত্যুদণ্ড

শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতে বলেন, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গঠিত চার্জ প্রমাণের জন্য সাক্ষীদের মাধ্যমে যে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্য, ডিএনএ রিপোর্ট, আলামত ও সাক্ষীদের বক্তব্য তুলে ধরে দাবি করেন, প্রধান আসামি সোহেল রানা পরিকল্পিতভাবে রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন এবং পরে মরদেহ গুমের চেষ্টা করেন। এ কাজে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সাক্ষ্য-প্রমাণে স্পষ্ট হয়েছে যে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের সহায়তায় ভিকটিমকে ধর্ষণ, হত্যা এবং পরে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে গুম করার চেষ্টা করা হয়।

‘ডলার’ প্রসঙ্গ বিচার বিভ্রান্তির চেষ্টা: রাষ্ট্রপক্ষ

শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় আসামির বক্তব্য দেওয়ার নির্দিষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সোহেল রানা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কোথাও ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির কথা বলেননি।

তিনি বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় ৩৪২ ধারায় আসামি পরীক্ষার সময় হঠাৎ ওই নামের উল্লেখ করেছেন। এটি জেলখানায় কোনো কুচক্রী ব্যক্তির পরামর্শে বলা হয়ে থাকতে পারে এবং আদালতের বিবেচনায় এর কোনো ভিত্তি নেই।

দুলু বলেন, তদন্ত ও মামলার নথিপত্রেও ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যায়ে এসে এমন নাম উল্লেখ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বিচার বিলম্বিত করার অপচেষ্টা হতে পারে।

অ্যাভিডেন্স অ্যাক্টের ১০৬ ধারা তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ

রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয়, ঘটনাটি ঘটেছে আসামিদের বসবাস করা ফ্ল্যাটে, যা ভিকটিমের পরিবারের ফ্ল্যাটের বিপরীতে অবস্থিত। সাক্ষ্য অনুযায়ী ওই ফ্ল্যাটের বাকি দুটি কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল এবং আসামিদের ব্যবহৃত কক্ষ ছাড়া সেখানে অন্য কারও উপস্থিতি ছিল না।

দুলু বলেন, অ্যাভিডেন্স অ্যাক্টের ১০৬ ধারা অনুযায়ী ফ্ল্যাটের ভেতরে কী ঘটেছে সে বিষয়ে ‘স্পেশাল নলেজ’ বা বিশেষ জ্ঞান আসামিদের কাছেই রয়েছে। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির অনুযায়ী কারও হেফাজতে বা সান্নিধ্যে থাকা অবস্থায় মৃত্যু ঘটলে সেই মৃত্যুর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তায়। কিন্তু এই মামলায় রামিসার মৃত্যু কিংবা মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার বিষয়ে আসামিরা কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

তিনি বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় রেকর্ড করা ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আসামিদের অপরাধে সংশ্লিষ্টতাকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করেছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত ও প্রয়োজনীয় তথ্যাদির মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

আসামিপক্ষের যুক্তি: মৃত্যুদণ্ড নয়, যাবজ্জীবন দিন

রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ আদালতে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা ছুরিটির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার সময় সোহেল রানা মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রধান আসামির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার আবেদন জানান।

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বলেন, ‌‘গতকাল আসামি নিজেই আদালতের কাছে নিজেকে দোষী বলে স্বীকার করেছে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। সে আদালতের কাছেও বলেছে, সে অপরাধ করেছে এবং মাফ চায়। সেহেতু আমি আদালতে বলেছি, তার বক্তব্য এবং রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক। যেহেতু সে অপরাধ স্বীকার করেছে, তাই তার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন করেছি।’

তিনি বলেন, ‘স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো লাশ গুমে সহায়তা করা। সে কারণে সংশ্লিষ্ট আইনে তার বিরুদ্ধে যে সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজা রয়েছে, আদালত যেন সেই বিধান অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করেন, সেই আবেদন করেছি।’

‘আসামিদের পক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষ্য ছিল না’

অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ বলেন, দেশজুড়ে আলোচিত হওয়ায় ঢাকা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য আসামিপক্ষে দাঁড়াবেন না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ফলে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে সরকার তাকে নিয়োগ দেয়।

তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় আসামির কোনো আইনজীবী না থাকলে রাষ্ট্রকে একজন আইনজীবী নিয়োগ দিতে হয়। সেই বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার আমাকে নিয়োগ দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসামিরা কোনো সাফাই সাক্ষ্য দিতে চাননি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণও আদালতে উপস্থাপন করেননি। এতে বোঝা যায়, নিজেদের পক্ষে উপস্থাপনের মতো কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ তাদের কাছে ছিল না। উপরন্তু প্রধান আসামি নিজেই আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন।’

আত্মপক্ষ সমর্থনে যা বলেছিলেন সোহেল ও স্বপ্না

এর আগে বুধবার (৩ জুন) আত্মপক্ষ সমর্থন ও সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেন।

বুধবারের শুনানিতে বিচারক মামলার ১৬ জন সাক্ষীর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ভিডিও প্রমাণ এবং বিভিন্ন আলামত আসামিদের সামনে উপস্থাপন করেন। এতে রামিসাকে খোঁজার ঘটনা, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট শনাক্তকরণ, রক্তের আলামত উদ্ধার এবং শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে অভিযোগ অনুযায়ী স্বপ্না আক্তার কীভাবে সোহেল রানাকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন, সে বিষয়ও আদালতে উল্লেখ করা হয়।

আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যে সোহেল রানা বলেন, ‘আমি নির্দোষ স্যার। স্যার, আমাকে মাফ করে দিন। ডলারকে ধরেন। আমি অপরাধ করেছি। তাকেও ধরেন।’

অপর আসামি স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমি কিছু করিনি।’

‘দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে’—রাষ্ট্রপক্ষ

বুধবার (৩ জুন) শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রক্রিয়া হবে। যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ, যুক্তিতর্ক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তার ভিত্তিতে যে বিচার আসবে, তাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস পাবে না বলে আমরা আশা করি।

মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণে যা উঠে এসেছে

মঙ্গলবার মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মামলায় মোট ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নিহত শিশুর বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা আদালতে সাক্ষ্য দেন। শিশু সাক্ষী হওয়ায় রামিসার বড় বোনের সাক্ষ্য ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। তদন্তকালে জব্দ করা কাটা গ্রিলসহ বিভিন্ন আলামতও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের মতে, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ রিপোর্ট এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

যে ঘটনা

গত ১৯ মে পল্লবীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা করেন।

পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়।

মামলায় সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত শেষে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

বৃহস্পতিবার বেলা ১টা ৩৫ মিনিটে রায়ের তারিখ ঘোষণার পর শুনানি শেষ হয়। পরে দুপুর ২টার দিকে দুই আসামিকে এজলাস থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে করে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়। এখন বহুল আলোচিত এ মামলার রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে নিহত রামিসার পরিবারসহ সারা দেশের মানুষ।

সূত্র : জাগোনিউজ

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.