ছবি সংগৃহীত
Advertisement

জুমবাংলা ডেস্ক : করোনাভাইরাসের কারণে দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আগামী ৬ জুন পর্যন্ত ছুটিতে রয়েছে। এই ছুটির পর সারাদেশের শিশু-শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ফিরে গিয়ে নতুন পরিবেশের মুখোমুখি হবে। আর এর পূর্ণাঙ্গ চিত্রপট কেমন হবে— তা নিয়ে বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে সরকার।

এই নতুনত্ব আসবে শ্রেণিকক্ষে, পরিবর্তন আসবে পাঠপ্রদানের ধরনে, বাড়বে রিমোট লার্নিং। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে শিশুরাও আগের মতো একসঙ্গে দলবেঁধে শ্রেণিকক্ষে যেতে পারবে না। সব মিলিয়ে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতিকে বৈশ্বিকভাবে ‘নিউ নরমাল’ নিয়ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন বলেন, ‘আমরা একটি রিকভারি প্ল্যান করেছি। বন্ধ থাকার মেয়াদ বাড়াতে না হলে এই পরিকল্পনা ধরে আমরা এগোবো। আর যদি অবস্থার উন্নতি না ঘটে, তাহলে এটাকে আমরা রিভিউ করে নতুন একটা প্ল্যান তৈরি করতে হবে। এটা নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কাজ করছে।’

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন গাইডলাইন। যে নির্দেশনার আলোকে শিশুদের শ্রেণিকক্ষে আসবে ‘নিউ নরমাল’ নিয়ম। যেগুলোকে সামনে রেখে ভবিষ্যতে নিরাপদে স্কুল কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

আগামী মধ্য জুন নাগাদ পুরো গাইডলাইন প্রস্তুত হয়ে গেলেই বিদ্যালয়গুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারি কবে শেষ তা নিয়ে কথা বলা অনিশ্চিত হওয়ায় স্কুলগুলোকে পুনরায় খোলার আগে বেশ কয়েকটি বিষয়কে বিবেচনায় রাখতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, শিশুর স্বাস্থ্য। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় সবরকম স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে শিশুদের স্কুলগামী করা; গত ১৭ মার্চ থেকে আগামী জুন অব্দি পড়াশোনায় যে ঘাটতি হয়েছে, তা রিকভার করা; রিকভারের পদ্ধতি কী হবে, তা ঠিক করা; শ্রেণিকক্ষ, পরিবহন, স্যানিটাইজেশন ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী সম্পন্ন করা; ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার, ঘন ঘন তাপমাত্রা চেকাপ, বারবার হাত ওয়াসহ সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি শিশুদের বুঝিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে, আগামীতে স্কুলগুলো খোলার পর শিক্ষার্থীরা আর আগের পরিবেশ দেখবে না, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তাদের প্রস্তুত করা। একই সঙ্গে শিক্ষক ও অভিভাবকদের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচয় করানো।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি তথ্য মতে, প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে সারাদেশে দুই কোটি নয় লাখ ঊনিশ হাজার দুইশ’একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বাংলাদেশে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৯৯টি। এর বাইরে কওমি মাদ্রাসাগুলোতেও প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে প্রায় পঁচিশ লাখ শিশু-শিক্ষার্থী রয়েছে বলে, বিভিন্ন সময় দাবি করা হয়েছে। এই শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্যবিধি ও সুরক্ষা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনও উদ্যোগ নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

নিরাপদ স্কুল পরিচালনা নিয়ে ইতোমধ্যে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে জাতিসংঘের শেষ সংস্থা ইউনিসেফ (বাংলাদেশ)।

সংস্থার শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ইকবাল হোসেন বলেন, স্কুলগুলো রি-ওপেনিং গাইডলাইন নিয়ে শেষ বিশ্বব্যাপী একটা নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। যেহেতু সহসাই এই মহামারির অবস্থা থেকে বের হতে পারবো না, একই সঙ্গে যে কনটেক্সটে আমরা ফিরে যাবো, তা একেবারেই আগের মতো “নরমাল” পরিস্থিতি না, একটা “নিউ নরমাল” পরিস্থিতিতে আমরা যাবো। সেক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে।

গত ১৩ মে ইউনেস্কোর একটি বুলেটিনে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এডুকেশন প্ল্যানিং (আইআইইপি) মনে করে, করোনার এই প্রাদুর্ভাব মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। তবে, জরুরিভিত্তিতে স্কুলে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করতে দেশগুলোর সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে নিরঙ্কুশভাবে মানুষের জীবন রক্ষা করার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ডিসট্যান্স এডুকেশন, পুনরায় ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ার সম্ভাবনা কেমন– ইত্যাদি বিষয়ে কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণের দিকটিও বিবেচনায় রাখার সুপারিশ রয়েছে।

এই বিশ্ব গাইডলাইনকে সামনে রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাসহ সরকারের বিদ্যমান নির্দেশনাগুলোর আলোকে নতুন গাইডলাইন প্রস্তুত হচ্ছে, বলে জানান ইকবাল হোসেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, অধিদফতরের মহাপরিচালকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে।

সম্ভাব্য রিকভারি প্ল্যান সম্পর্কে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহ্ জানান, তিনি আশা করছেন সহসাই স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন স্কুল খুলবো তখন রিকভারি প্ল্যানে স্কুলের অবস্থা কী হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্কুলের পরিবেশগত বিষয়, শিশুদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা, কীভাবে তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে, অভিভাবকদের সচেতন করা, কমিউনিটিকে কীভাবে যুক্ত হবে, শিক্ষকরা কীভাবে কাজ করবেন, এ বিষয়গুলো থাকবে।’

হবিগঞ্জ জেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আশরাফুল হক খোকন বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে এখন বিদ্যালয় বন্ধ। আগামী ৭ জুন যদি খোলার চিন্তাভাবনা সরকারের থাকে, সেক্ষেত্রে আগে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে হবে। তাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা দেওয়া, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে, হাওর অঞ্চলে অনেক কঠিন। শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পড়ানোর আর সুযোগ নেই। তাদের কয়েকটি দলে ভাগ করে পড়াতে হবে। এর মধ্যে শিশুদের পড়াশোনায় যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, তা চিহ্নিত করে দরকারি সিলেবাসগুলো পড়াতে হবে। সাধারণত, আগস্টে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা থাকে। এবার তা না হলেও সমস্যা বেশি হবে না। প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির পরীক্ষা না নিলেও হবে।

কিন্তু চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, জুনেও যদি স্কুল বন্ধ রাখতে হয়, তাহলে সব শ্রেণির সিলেবাসের ওপর চাপ পড়বে।’

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা-২০১৭ (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) থেকে দেখা গেছে, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মার্চ মাসে মোট কার্যদিবস ছিল ২৪টি, এপ্রিলে ২৩ ও মে মাসে ১৭ কার্যদিবসে ক্লাস হওয়ার কথা রয়েছে। জুলাইতে ২৬ ও আগস্টে ২৪ কার্যদিবসে ক্লাস হওয়ার কথা। আগস্টে শিশুদের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা হওয়ার কথাও বলা রয়েছে পরিকল্পনায়।

‘সিলেবাস শেষ করতে স্কুলের সময় বৃদ্ধি করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাতে করে শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। আমরা শিক্ষকরা হয়তো এক ঘণ্টা বেশি ক্লাস নেবো, কিন্তু বাচ্চাদের ধরে রাখা কঠিন।’ বলেন আশরাফুল হক।

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফসিউল্লাহ বলছেন, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা যতটুকু মিস হয়েছে, তার সমাধানে তারা কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘শিশুদের স্কুলে আনার পর তাদের লেখাপড়ার কাজ যতটুকু মিস হয়েছে, সেক্ষেত্রে আমরা ক্লাসের সময় বাড়াবো কিনা, পরীক্ষাগুলো কীভাবে নেবো, দুটো পরীক্ষা একসঙ্গে নেবো কিনা, আমাদের পেশেন্ট আরও বাড়বে কিনা, সবকিছু মিলিয়েই রিকভারি প্ল্যান করছি।’

ফসিউল্লাহ জানান, শিক্ষকদেরও প্রস্তুত করা হবে। তারাও শিক্ষার্থীদের অবস্থা নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কার বাসায় টিভি আছে, কার বাসায় নেই— এসব বিষয়ও তারা জানছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহ্ বলেন, ‘ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ থাকলেও তাদের লেখাপড়ার ধারাবাহিকতা রাখার জন্য আমরা সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম “ঘরে বসে শিখি”র মাধ্যমে সম্প্রচার করে আসছি। শিশুরা ঘরে বসে খুব উপভোগ করছে। এছাড়া শিক্ষক, অভিভাবকদের মাধ্যমে শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতন ও পড়াশোনায় মনোযোগী থাকতে উদ্বুদ্ধ করছি।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফসিহউল্লাহ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই মহামারির পর বিশ্বের যেসব দেশ কাজ শুরু করেছে, আন্তর্জাতিক যেসব সংস্থা কাজ করছে, সে বিষয়গুলোকেও আমরা বিবেচনায় নেবো।’

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Sabina Sami is a Journalist. He is the Sub-Editor of Zoom Bangla News. He is also a good writer.