নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় ২০২৫ সালে ভয়াবহ অপরাধচিত্র সামনে এসেছে। মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে খুন, ধর্ষণ ও নানা সহিংস ঘটনার সংখ্যা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

থানা সূত্র জানায়, গত এক বছরে শ্রীপুর উপজেলায় ৩৩টি হত্যাকাণ্ড, ৪২টি ধর্ষণ মামলা এবং ৭০টি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড হয়েছে। একই সময়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ১১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে আত্মহত্যা ও অপমৃত্যুর একাধিক ঘটনায় স্বজনেরা মামলা না করায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবারের বিস্তার এবং জমি দখল–সংক্রান্ত দ্বন্দ্বই অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূল কারণ। বছরের বিভিন্ন ঘটনায় এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পৌরসভার মসজিদ মোড় এলাকায় গভীর রাতে স্ত্রী ও সন্তানের সামনে হাসিবুল ইসলাম বাদশা নামে এক পল্লি চিকিৎসককে ইট ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে একটি কিশোর গ্যাং। গ্যাং লিডার রুবেলের নেতৃত্বে সংঘটিত এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
৩০ এপ্রিল রাজাবাড়ি ইউনিয়নের নানাইয়া গ্রামে মাদকাসক্ত ছেলেকে ঘুমন্ত অবস্থায় গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে বাবা মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে। পরদিন তিনি নিজেই থানায় আত্মসমর্পণ করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ছেলের লাগামহীন মাদকাসক্তি ও নির্যাতনের কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান তিনি।
এর পরদিন ১ মে কাওরাইদ ইউনিয়নের যোগীরসিট গ্রামে জমি বিরোধের জেরে মো. নাজমুল ইসলাম নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিবেশী মফিজ উদ্দিনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
গত ৯ মার্চ পৌরসভার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকায় গার্মেন্টস কর্মী মো. রেজাউল করিমকে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি শাহাদাত হোসেন শান্ত ও নূরুল ইসলাম ওরফে পাগলা মামু জড়িত।
বছরের শেষ দিকে, ২৩ ডিসেম্বর গোসিঙ্গা ইউনিয়নের লতিফপুর গ্রামে জাসাস নেতা ফরিদ সরকারকে ইটভাটায় ডেকে নিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ তিনজন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করেছে।
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ২৪ অক্টোবর পৌরসভার মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় এক মাদ্রাসার শিশুশিক্ষার্থীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে মাদ্রাসাশিক্ষক মোহাম্মদ মহসিনের বিরুদ্ধে। পরে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে তিনি আহত হন এবং পুলিশ তাঁকে আটক করে।
এ ছাড়া ১০ জানুয়ারি পৌরসভার ফখরুদ্দীন এলাকায় এক গার্মেন্টস শ্রমিকের বোনকে ধর্ষণের অভিযোগে আলোচনার সৃষ্টি হয়। দুই দিন পর পুলিশ একটি পরিত্যক্ত বসতবাড়ি থেকে ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর ভাইকে উদ্ধার করে।
শ্রীপুর সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি রৌশন হাসান রুবেল বলেন, এখনই সময় সবাইকে সচেতন হওয়ার। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে মাদক ও অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাছির আহমদ জানান, গত বছরে সংঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। বেশির ভাগ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনায় ৪২টি এবং অপমৃত্যুর ঘটনায় ৭০টি মামলা হয়েছে। কিছু আত্মহত্যার ঘটনায় স্বজনেরা মামলা করেননি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


