জাহিদ ইকবাল: সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব হলো সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং জনস্বার্থে তা প্রকাশ করা। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে—সত্য প্রকাশের পথ কখনোই নিরপেক্ষ ও নিরাপদ থাকে না, বিশেষ করে যখন সেই সত্য ক্ষমতা, দল, মতাদর্শ কিংবা জনপ্রিয় আবেগকে অস্বস্তিতে ফেলে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে—সাংবাদিকের লেখা বা অনুসন্ধানকে তথ্য দিয়ে খণ্ডন না করে, তাকে একটি রাজনৈতিক “ট্যাগ” দিয়ে বাতিল করার চেষ্টা। এতে করে যুক্তি হারছে, বাড়ছে বিভাজন; আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনস্বার্থ।

একজন সাংবাদিক যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর কোনো নীতি, সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সমালোচনা করেন, তখন দ্রুত একটি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়—তাকে বিরোধী শিবিরের লোক বলে চিহ্নিত করা। আবার যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর কোনো ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা নীতিগত অসংগতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তখন উল্টো দিক থেকে একই কৌশল প্রয়োগ হয়—“ও তো অন্য দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।” এই মানসিকতা তথ্যকে বিতর্কের কেন্দ্রে না রেখে পরিচয়কে কেন্দ্রে বসায়।
রাজনৈতিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষণে একটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো source derogation—অর্থাৎ, কোনো বক্তব্যকে খণ্ডন না করে বক্তার বিশ্বাসযোগ্যতা আক্রমণ করা। ট্যাগিং সংস্কৃতি ঠিক এই কাজটাই করে। আপনি কী বলছেন, তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়—আপনি “কার লোক”। ফলে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের বদলে শুরু হয় পরিচয় যাচাই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–কে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সাংবাদিককে একদল “বিরোধী শক্তির দালাল” বলবে, আবার অন্য দল বলবে “দেরিতে হলেও সত্য লিখেছে।” অর্থাৎ একই লেখার বিপরীত দুই রাজনৈতিক পাঠ তৈরি হয়—দলীয় অবস্থানের ভিত্তিতে। এতে বোঝা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই পাঠকের প্রতিক্রিয়া তথ্যনির্ভর নয়, বরং পক্ষনির্ভর।
রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ নিয়ে মিডিয়া স্টাডিজে বহু গবেষণায় দেখা গেছে—দলীয় সমর্থকেরা সাধারণত “confirmation bias”-এর শিকার হন। তারা সেই তথ্যকেই সহজে গ্রহণ করেন যা তাদের পূর্বধারণাকে সমর্থন করে, আর বিপরীত তথ্যকে ষড়যন্ত্র বা প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দেন। দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণায়ও উল্লেখ আছে, দলীয় আনুগত্য যখন পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়, তখন তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে অনুভূত হয়।
জাতীয় পার্টি–কে নিয়ে সমালোচনায় তুলনামূলকভাবে প্রতিক্রিয়া কম—এমন পর্যবেক্ষণও মিডিয়া অঙ্গনে শোনা যায়। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্র ও জনআবেগের কেন্দ্র যেখানে বেশি, প্রতিক্রিয়ার তীব্রতাও সেখানে বেশি। আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর মতো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুললে অনেক সময় সমালোচনাকে আদর্শবিরোধী বা দেশবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এখানে যুক্তির বদলে আবেগ দ্রুত সক্রিয় হয়।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ইতিহাস, শহীদদের স্মৃতি বা জাতীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধানী লেখা প্রকাশ করাও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইতিহাসের ব্যাখ্যা বা ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুললেই “অপমান”, “অস্বীকার” বা “বিশ্বাসঘাতকতা”র অভিযোগ আসে। অথচ ইতিহাস গবেষণার মূল ভিত্তিই হলো প্রশ্ন করা, দলিল যাচাই করা, নতুন তথ্য সামনে আনা। প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করলে ইতিহাসও একসময় প্রোপাগান্ডায় পরিণত হয়।
ট্যাগিং সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি তিনটি জায়গায় হয়।
প্রথমত, সাংবাদিকতার ওপর চাপ তৈরি হয়। সাংবাদিক তখন তথ্য যাচাইয়ের আগে ভাবেন—এটি প্রকাশ করলে কোন পক্ষ কী প্রতিক্রিয়া দেবে। এতে স্ব-নিয়ন্ত্রণ (self-censorship) বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, পাঠকের তথ্যপ্রাপ্তি বিকৃত হয়। কারণ তারা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতা না দেখে দলীয়ভাবে বাছাই করা তথ্য দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক বিতর্ক দুর্বল হয়। গণতন্ত্র টিকে থাকে তথ্যসমৃদ্ধ বিতর্কের ওপর; ট্যাগিং সেই বিতর্ককে আবেগী সংঘাতে নামিয়ে আনে।
“বিরুদ্ধে লেখা” আর “সত্য লেখা”—এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুল ধরিয়ে দেওয়া মানেই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং সেটিই জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ। বিশ্বব্যাপী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বড় বড় কাজ—দুর্নীতি উন্মোচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রকাশ, ক্ষমতার অপব্যবহার সামনে আনা—সবই কোনো না কোনো শক্তির “বিরুদ্ধে” গেছে। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেগুলোকে জনস্বার্থের কাজ হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ
তারেক রহমানের প্রতি আস্থার প্রতিফলন এই বিজয়: শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট
সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয় না; বরং উন্নতির উপকরণ হিসেবে দেখা হয়। সাংবাদিককে দলীয় চশমা দিয়ে না দেখে তথ্যের মানদণ্ডে বিচার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে না পারলে—আমরা লেবেল পাবো, কিন্তু সত্য পাবো না। আর সত্য হারালে, শেষ পর্যন্ত হারবে জনস্বার্থই।
লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


