সোয়াদ সাদমান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পরিবেশগত সংকট ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক স্টাডি ট্যুর ও মাঠপর্যায়ের জরিপে দ্বীপটির কোরাল, ম্যানগ্রোভ বন, মৎস্যসম্পদ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপে দেখা যায়, একসময় সেন্টমার্টিনে যেখানে প্রায় ৮০ থেকে ৮২ প্রজাতির কোরাল পাওয়া যেত, বর্তমানে সেখানে মাত্র ৪০টির মতো প্রজাতি শনাক্ত করা যাচ্ছে। এর মধ্যে এক্রোফোরা ব্রাঞ্চিং কোরাল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গবেষকদের মতে, পানির স্বচ্ছতা কমে যাওয়া ও শারীরিক ক্ষতির কারণে এই প্রজাতির কোরাল দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
দ্বীপের দক্ষিণাংশে অবস্থিত প্রায় পাঁচ একর আয়তনের একটি ম্যানগ্রোভ বনও ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। উপকূলীয় সুরক্ষা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বন উজাড় হওয়ায় দ্বীপের পরিবেশ আরও নাজুক হয়ে পড়ছে।
এদিকে দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত ছেড়া দ্বীপ এলাকা বর্তমানে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত হলেও বাস্তবে সেখানে নিয়মিত পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে। জরিপে দেখা যায়, পর্যটকদের বহনকারী নৌকাগুলো কোরালের ওপর নোঙর ফেলায় প্রবাল ভেঙে যাচ্ছে এবং পানির স্বচ্ছতা নষ্ট হচ্ছে। এতে কোরালের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। যদিও এই এলাকায় পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ, তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের নজর এড়িয়ে গভীর রাত বা ভোরবেলায় পর্যটকদের সেখানে যাতায়াতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বললে তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার ও জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেন। তবে গবেষকদের মতে, এই সংকটের প্রধান কারণ হতে পারে অতিরিক্ত মাছ আহরণ বা ওভার হারভেস্টিং, যা দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের দাবি, সরকারের দ্বীপকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগণের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। পর্যটক সংখ্যা সীমিত করায় অনেক স্থানীয় বাসিন্দা আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে জানান তারা। স্থানীয়দের মতে, পর্যটনের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের একটি বড় কারণ।
জরিপে আরও দেখা যায়, সেন্টমার্টিনে দূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস এই ছোট পাথুরে দ্বীপে হলেও নেই কার্যকর পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা কিংবা কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পর্যটক সীমিত করায় প্লাস্টিক দূষণ কিছুটা কমলেও পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাব রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পর্যটন নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
আরও পড়ুনঃ
স্থানীয় বাসিন্দা ও রিসোর্ট মালিকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে ময়লা পরিবহনের জন্য কোনো গাড়ি বা জনবল নেই। ফলে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় যত্রতত্র ময়লার স্তূপ জমে রয়েছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের শিক্ষক আয়শা আক্তার
ড. মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ চৌধুরী,
রায়হানুর ইসলাম রাসেল,
সৌরভ সাহা জয় তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা এই স্টাডি ট্যুর ও জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। শিক্ষার্থীদের মতে, সেন্টমার্টিন দ্বীপ রক্ষায় কাগুজে পরিকল্পনার পরিবর্তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা জরুরি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


