সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্য নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে মন্তব্য করেছেন, তা নতুন কিছু নয়। ২০১২ সালেও তিনি প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান। ‘সেভেন সিস্টার্স’—এই শব্দটি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত আলোচনা ও কানেকটিভিটি প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে।
সেভেন সিস্টার্স: একটি ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য হলো—অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা। এই অঞ্চলটি ভারতের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং একমাত্র সড়কপথে যোগাযোগ সম্ভব ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত একটি সরু করিডোর দিয়ে।
Table of Contents
এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং সমুদ্রপথে অভিগম্যতার অভাব একে একটি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানে নিয়ে গেছে। এই কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর মন্তব্য যে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের জন্য একটি ‘সমুদ্রের অভিভাবক’ হিসেবে কাজ করতে পারে, সেটি যথার্থ এবং বাস্তবমুখী বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
একই ধরণের মত ২০২৩ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীও ব্যক্ত করেছিলেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে সেভেন সিস্টার্স এবং বাংলাদেশকে একটি ভ্যালু চেইনে আবদ্ধ করা যেতে পারে।
২০১২ সালের প্রেক্ষাপট: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ড. খলিলুর রহমান জানান, ড. ইউনূস এই বক্তব্য ২০১২ সালেও দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন এত আলোচনার জন্ম দেয়নি। বর্তমানে এই মন্তব্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই অনেকের ধারণা। ২০১২ সালে যখন এই মন্তব্য করা হয়েছিল, তখনও দক্ষিণ এশিয়ায় কানেকটিভিটির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা যাচ্ছিল, তবে তা আজকের মতো ব্যাপক আলোচিত ছিল না।
বর্তমানে BIMSTEC, BBIN ও অন্যান্য আঞ্চলিক ফোরামের আলোচনায় সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এমনকি চীন, জাপানসহ বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্রের আগ্রহও এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান।
বাংলাদেশের ভূ-অবস্থান ও সম্ভাবনার দুয়ার
বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক করিডোর হিসেবে কাজ করতে পারে সেভেন সিস্টার্সের জন্য। দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ সংযোগকে আরও গতিশীল করতে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটান (BBIN) উদ্যোগের পাশাপাশি BIMSTEC-এর মতো আঞ্চলিক ফোরামগুলো এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করে এই রাজ্যগুলোকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে যুক্ত করা গেলে তা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, সেভেন সিস্টার্স-এর জন্যও হবে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। বাংলাদেশের ভূ-অবস্থান তাই আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কানেকটিভিটির গুরুত্ব ও বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান
ড. খলিলুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, বাংলাদেশ কারও উপর জোর করে কানেকটিভিটি চাপিয়ে দিতে চায় না। বরং সুযোগ থাকা সাপেক্ষে যদি কোনো পক্ষ স্বেচ্ছায় এই সুযোগ গ্রহণ করতে চায়, তাহলে সেটি স্বাগত জানানো হবে।
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ড. ইউনূস-এর মন্তব্যের পেছনে রাজনৈতিক বা ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল না। বরং দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়ন ও সংযোগের সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। এই ধরনের উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ায় বহু আগেই আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে।
যৌক্তিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন
বর্তমানে কিছু মহল এই মন্তব্যকে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়াতে চাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অথচ এই বক্তব্য শুধু একটি ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। একীভূত উন্নয়ন যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেভেন সিস্টার্স সহ পুরো অঞ্চলটি নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্তে পৌঁছাবে।
উপসংহার: সঠিক ব্যাখ্যায় সম্ভাবনার দিগন্ত
সেভেন সিস্টার্স নিয়ে ড. ইউনূস-এর বক্তব্য একেবারে নতুন কিছু নয়। ২০১২ সালেও তিনি এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক শক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য একটি বাস্তবমুখী রূপরেখা প্রদান করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা আরও সময়োপযোগী হয়ে উঠেছে।
FAQs
- সেভেন সিস্টার্স কী?
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে যৌথভাবে বলা হয় ‘সেভেন সিস্টার্স’। - ড. ইউনূস কেন এই অঞ্চল নিয়ে মন্তব্য করেছেন?
তিনি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন। - এই মন্তব্য কেন বিতর্ক তৈরি করেছে?
কিছু মহল এই বক্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।