প্রতীকী ছবি
Advertisement

জুমবাংলা ডেস্ক: ‘স্বপ্নের দেশ’ আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাংলাদেশি যুবকদের ১১টি দেশ পাড়ি দেওয়াচ্ছে একটি শক্তিশালী পাচারকারী চক্র। বিপত্সংকুল এ যাত্রায় প্রতি পদে পদে রয়েছে মৃত্যুর হাতছানি। রয়েছে প্রতি মুহূর্তে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ভয় ও আতঙ্ক। জলাশয়, বন ও পাহাড়ি এলাকা পেরিয়ে, অনেকেরই স্বপ্নের দেশে পৌঁছানোর সুযোগ হয় না। মারা পড়েন পথে। লাশটিও পড়ে থাকে সেখানে। ভয়ংকর এ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে গত ১০ বছরে মারা পড়েছেন সহস্রাধিক বাংলাদেশি। ভাগ্য পরিবর্তনের বদলে অনেকের কপালে জুটেছে জেলের নিষ্ঠুর বন্দিজীবন, আর্থিক লোকসান। আমেরিকা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে পাচারকারী চক্রটি একেক যুবকের কাছ থেকে ৬০-৬৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকের আজকে সংখ্যায় প্রকাশিত সিনিয়র রিপোর্টার জামিউল আহসান সিপু’র করা একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

পাচারকারী কারা

গত ১০ বছরে দেশ থেকে ২০ হাজার মানুষ পাচার হয়েছে ব্রাজিলে। ব্রাজিলের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় ঘনবসতিপূর্ণ শহর সাও পওলোতে এই সিন্ডিকেট সক্রিয়। সাও পওলোর ক্যানিন্দের অরনেলাস স্ট্রিটে বাংলাদেশি সাইফুল্লাহ আল মামুন ওরফে সাইফুল ইসলাম ‘বিডি ট্যুর এলটিডিএ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষ পাচার করেছেন। এছাড়াও বাংলাদেশি সেলিম ওরফে আনোয়ার হোসেন, রুহুল আমিন চঞ্চল, হারুনুর রশিদ, আহমেদ রনি, এম ডি বুলবুল হোসাইন, জাওয়াদ আহমেদ, তমোর খালিদ, ইরফান চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, শাকিল হোসাইন শামুল, আবদুল করিম ও যুবায়ের হোসাইনের পৃথক সিন্ডিকেট বাংলাদেশ থেকে মানুষ পাচার করে।

হাতিয়ে নেয় ৬০-৬৫ লাখ টাকা

বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত পৌঁছতে চক্রটি একেক জনের কাছ থেকে নেয় ৪০ লাখ টাকা। এরপর ব্রাজিল থেকে আমেরিকায় পৌঁছানোর জন্য ২০ লাখ টাকায় চুক্তি হয় সিন্ডিকেটের সঙ্গে। এছাড়া বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে মেক্সিকোর সীমান্তে পৌঁছতে মাথাপিছু খরচ হয় আরো পাঁচ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ৬৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আমেরিকায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে।

যেভাবে সিন্ডিকেটের মুখোশ খুলে

মেক্সিকো সীমান্তে আমেরিকান বর্ডার ফোর্সের হাতে শত শত বাংলাদেশি আটক হলে এই সিন্ডিকেটের মানবপাচারের বিষয়টি জানা যায়। পাচারের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। সংস্থাটি ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশের সহায়তায় গত নভেম্বরে সাও পওলো থেকে ছয় বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করে। পাচারকারী সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই ছয় জনকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বাংলাদেশি সিন্ডিকেটের সঙ্গে নেপাল, ভারত ও পাকিস্তানের সিন্ডিকেটের যোগাযোগ রয়েছে। চার দেশীয় সিন্ডিকেট একযোগে কাজ করে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমেরিকায় মানুষ পাচার করতে।

দশ বছরে সহস্রাধিক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু

সম্প্রতি ব্রাজিলের সাও পওলোর ফেডারেল পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে একটি রিপোর্ট বাংলাদেশের পুলিশের কাছে পাঠিয়েছে। ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে আমেরিকা বা মেক্সিকো সীমান্তে গ্রেফতার হচ্ছে। রিপোর্টে কলম্বিয়া ও পানামার মধ্যবর্তী এলাকার ড্যারিয়েন গ্যাপ নামে একটি গভীর বনের কথা উল্লেখ করা হয়। ড্যারিয়ান গ্যাপের ঘন বনভূমি, পাহাড়, জলাধার পাড়ি দিতে গিয়ে গত ১০ বছরে বাংলাদেশের সহস্রাধিক যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব হতভাগ্য যুবকের বাড়ি। তারা অনাহারে, বিষধর সাপের ছোবলে এবং জাগুয়ারসহ নানা বন্যপ্রাণীর আক্রমণে মারা পড়ে।

যেভাবে পাচার হয় : পাচারকারী চক্রটি মূলত মানবপাচারে পুরোনো ‘ডঙ্কি ফ্লাইট’- (বিভিন্ন দেশে থেমে থেমে যাত্রা) পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। পাচারকারী সিন্ডিকেটের প্রতিনিধিরা প্রথমে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ সংগ্রহ করে। এরপর তাদের আনা হয় ঢাকায়। ঢাকা থেকে ইথিওপিয়ার গুয়ারহোলস বিমানবন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিট হিসেবে। এরপর সেখান থেকে ব্রাজিলের সাও পওলো পর্যন্ত আসে বিমানে করে। ব্রাজিল থেকে এক হাজার ডলার খরচ করে ইকুয়েডরের কুইটো পর্যন্ত যায় পাচারের শিকার মানুষেরা। তাদের সঙ্গে পাচারকারী সিন্ডিকেটের প্রতিনিধিরা থাকেন। পরে ইকুয়েডরের কুইটো থেকে কলম্বিয়ার সীমান্তবর্তী শহর টাল্কানে নিয়ে যায় বাসে করে। সেখানে এক দিন লুকিয়ে রেখে ওদের বাসে করে টার্বোতে নেওয়া হয়। টার্বোতে পৌঁছার পর নৌপথে গালফ অব উরাবা পেরিয়ে কলম্বিয়ার দস্যু নিয়ন্ত্রিত শহর কাপুরগুয়ানায় পৌঁছে পাচারের শিকার মানুষেরা। এরই মধ্যে প্রত্যেক রুটে রুটে পাচারকারী চক্রের প্রতিনিধি পরিবর্তন হয়। অর্থাত্ একেক প্রতিনিধির দায়িত্ব একেকটি রুট পার করে দেওয়া। প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেন ব্রাজিল, কোস্টারিকা বা ইকুয়েডরের নাগরিকেরা। তারা নিজেদের স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দেয়। কাপুরগুয়ানা থেকে ড্যারিয়েন গ্যাপ বন অতিক্রম করতে হয় পাচারের শিকার বাংলাদেশিদের। বনটি ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গভীর। এই জঙ্গল অতিক্রম সহজ নয়। এই বনেই অনেক বাংলাদেশি মারা পড়েছে। তাদের লাশ সেখানে ফেলে রেখে অন্যরা চলে যায়। এই জঙ্গলে রয়েছে পানামার ডাকাত দলের আনাগোনা। এদের শিকার হয়েও অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। ডাকাতরা ভাগ্য বদলের আশায় রওনা হওয়া বাংলাদেশিদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় সঙ্গে থাকা মুদ্রা। অনেকে সর্বস্ব খুইয়ে ফের ফিরে আসে কলম্বিয়ার কাপুরগুয়ানায়। তারপর বাংলাদেশে ফোন করে আত্মীয়দের কাছ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা আনে। আবার তারা রওনা দেয়। ড্যারিয়েন গ্যাপ পেরিয়ে বাসে করে পানামায় পৌঁছে। পানামা থেকে বাসে লুকিয়ে কোস্টারিকা পর্যন্ত পৌঁছে। কোস্টারিকা পৌঁছাতে প্রায় ২ হাজার ডলার খরচ হয় জনপ্রতি। কোস্টারিকার পশ্চিম সীমান্তে যেতে পুলিশের চেকপোস্টে প্রতি অনুপ্রবেশকারীদের গুনতে হয় ৩৫ ডলার। এরপর সূর্যাস্তের পর নৌকায় প্রায় ৩ ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে নিকারাগুয়ার মূল ভূখণ্ড দিয়ে হুন্ডুরাস সীমান্তে পৌঁছে। এ পর্যন্ত আসতে দুইটি চেকপোস্টে ৪০ ডলার দিতে হয় জনপ্রতি। এরপর বাসে করে তারা মূল হুন্ডুরাস ঢোকে। সেখান থেকে গুয়াতেমালা পৌঁছার জন্য আরেকটি জঙ্গল ছয় ঘণ্টা হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। এই জঙ্গলে ডাকাতের কবলে পড়লে জনপ্রতি আরো ৪০ ডলার গুনতে হয়। সেখান থেকে পাচারের শিকার ব্যক্তিরা যায় মেক্সিকো। মেক্সিকো থেকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য জাল কাগজপত্র বানাতে আরেকটি সিন্ডিকেটের শরণাপন্ন হতে হয়। মেক্সিকোতে অবস্থান করার সময় সেখানে জমির মালিকরা অনুপ্রবেশকারীদের সস্তায় শ্রমিক হিসেবে খেতে কাজ করায়। আমেরিকা ও মেক্সিকো সীমান্ত ৯ ভাগে বিভক্ত। সবচেয়ে ছোট সীমান্ত এল সেন্ট্রো—যা আমেরিকার অ্যারিজোনা-ক্যালফোর্নিয়া সীমান্তের পশ্চিমে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এই সীমান্তের এলপেসো, নোগালিস, বাজা ক্যালফোর্নিয়া ও সোনোরান মরুভূমি। সোনোরান মরুভূমি পাড়ি দিলেই আমেরিকান সীমান্ত। কিন্তু সোনোরান মরুভূমি এতটাই ভয়ঙ্কর যে, সেটা পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকেই মারা যায়। ১০০ কিলোমিটার হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। এই মরুভূমি থেকে মেক্সিকান ও আমেরিকান পুলিশ মাঝে মধ্যেই বাংলাদেশিদের লাশ উদ্ধার করে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Md. Mahamudul Hasan, widely known as Hasan Major, is a career journalist with over two decades of professional experience across print, broadcast and digital media. He is the founding Editor of Zoombangla.com. He has previously worked for national English daily New Age, The Independent, The Bangladesh Observer, leading Bangla daily Prothom Alo and state-owned Bangladesh Betar. Hasan Major holds both graduate and postgraduate degrees in Communication and Journalism from the University of Chittagong.