ভোর সাড়ে ৬টা। দিনের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। এই সময় হঠাৎ চুয়াডাঙ্গা সদরের সরোজগঞ্জ বাজারে যেন নেমে এলো কেয়ামতের অন্ধকার। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা একটি নৈশকোচ আলমসাধু (স্থানীয় যান) ও একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিলে নিভে যায় ছয়টি প্রাণ। চালক ঘুম ঘুম চোখে বাসটি চালাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন এর যাত্রীরা। এর ঠিক ১০ ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টায় দ্বিতীয় মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। সেখানকার মানকোন এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা জামালপুরগামী একটি বাস সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে চাপা দিলে মারা যান একই পরিবারের তিনজনসহ সিএনজির সাত যাত্রী। এই ১৩ জন ছাড়াও গতকাল শনিবার ও আগের দিন রাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন শিশুসহ আরও ১৪ জন। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
চুয়াডাঙ্গায় নিহত ছয়জন হলেন- সদর উপজেলার তিতুদহ গ্রামের তাহাজ্জত হোসেনের ছেলে সোহাগ আলী (২৫), রহিম মল্লিকের ছেলে শরিফ উদ্দিন (৩০), পিত্তর আলীর ছেলে রাজু আহমেদ (৪৫), হায়দার আলীর ছেলে কালু (৪০), বসু ভান্ডারদহের নিতাইয়ের ছেলে ষষ্ঠী (৪২) ও খাড়াগোদার মাহাতাব উদ্দিনের ছেলে মোটরসাইকেল আরোহী মিলন হোসেন (৪০)। নিহতদের পাঁচজনই ছিলেন দিনমজুর। কাজের সন্ধানে তারা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন।

বাসের এক যাত্রী বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা বাসটি ঝিনাইদহ শহর পার হওয়ার পর চালক প্রায় ঘুমের ঘোরে বাসটি চালাচ্ছিলেন। যাত্রীরা বার বার সুপারভাইজার ও চালককে বিষয়টি অবগত করলেও কেউ কর্ণপাত করেননি। তাদের এই খামখেয়ালির কারণেই এত মানুষকে প্রাণ দিতে হলো।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কনক কুমার দাসসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। হতাহতদের খোঁজ নিতে পরে হাসপাতালে ছুটে যান জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাদিকুর রহমান।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ওসি আবু জিহাদ ফখরুল আলম জানান, ঘাতক বাসসহ এর চালক আশাবুল আলমকে আটক করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় নিহতরা হলেন- টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার সোলাকুড়ি ইউনিয়নের নয়াকুড়ি গ্রামের নুর ইসলাম (৩০), তার স্ত্রী তাসলিমা (২৬), তাদের শিশুকন্যা লিজা (১০), অটোরিকশার চালক মো. আলাদুল (৩৮), যাত্রী মো. নজরুল (৩৫), নজর ইসলাম (৫৫) ও সাইদুল ইসলাম (৪৫)। এ চারজন মুক্তাগাছা উপজেলার ইসাখালী গ্রামের বাসিন্দা।
মুক্তাগাছা থানার ওসি বিপ্লব কুমার বিশ্বাস জানান, গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় মুক্তাগাছা-জামালপুর সড়কের মানকোনের রায়থুরা এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রাজীব পরিবহন নামের একটি বাসের সঙ্গে ময়মনসিংহগামী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান চারজন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
ওসি আরও জানান, ঘাতক বাসটিসহ এর চালক মকবুল হোসেনকে আটক করা হয়েছে। থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ ও শনির আখড়ায় পৃথক দুর্ঘটনা এক নারী ও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- শাকিল নাহার (৩০) ও মো. পারভেজ (২৮)। শাকিল নাহার স্বামী ও আট বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে মোটরসাইকেলে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থেকে নোয়াখালী যাচ্ছিলেন। সকাল ৯টার দিকে রায়েরবাগ এলাকায় তাদের মোটরসাইকেলকে পেছন থেকে একটি তেলের গাড়ি ধাক্কা দিলে তারা মোটরসাইকেল থেকে রাস্তার পাশে পড়ে যান। তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে দুপুর ২টার দিকে চিকিৎসক নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া ভোররাতে শনির আখড়ায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়লে চালক পারভেজ মারা যান।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া ও সিংরাইয়ে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন। গতকাল সকালে সাটুরিয়া হরগজ পূর্বনগর মসজিদের সামনে রাস্তা পার হতে গিয়ে অটোভ্যানের চাপায় ধূল্যা গ্রামের রফিকুল ইসলামের পুত্র শিশু রবিউল ইসলাম, দুপুরে সাটুরিয়া-বালিয়াটী সড়কের সওদাগর পাড়ায় মোটরসাইকেলের সঙ্গে সংঘর্ষে বাইসাইকেল আরোহী জামাল হোসেন (৬৫) মারা যান। অন্য ঘটনা শুক্রবার রাত ৮টায়। সিংরাই বাস্তা বাসস্ট্যান্ডের সামনে মোটরসাইকেলের সঙ্গে লেগুনার সংঘর্ষে খাদের পানিতে পড়ে লেগুনার যাত্রী শিশু আব্দুল্লাহ ও মোটরসাইকেল আরোহী আশরাফ খান নিহত হন।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের সাওঘাট এলাকায় শুক্রবার রাতে ট্রাকের সঙ্গে যাত্রীবাহী সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যান শরীয়তপুরের ডামুড্যা থানার নাসির মাতবর (২৮) ও আড়াইহাজারের পাঁচগাঁও চরপাড়া গ্রামের সাহিদ মিয়ার ছেলে ওয়াজিদ (১৪)।
খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া আঙরদোহা দাখিল মাদ্রাসার সামনে গতকাল দুপুরে ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী রুদাঘরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইমান আলী মোল্লা (৬৮) নিহত হয়েছেন।
গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলাম আকন্দের ছেলে স্বাধীন ইসলাম আকন্দ (১৬) গতকাল সকালে পলাশবাড়ীতে রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাকের ধাক্কায় মারা যান।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাইয়ের খাতরা কচকচ এলাকায় গতকাল সকালে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ব্র্যাক কর্মকর্তা আলাউদ্দিন শেখ (৪৭) নিহত হন। তার বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে পাঁচ দিন আগে বিয়ে করেন তিনি।
ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার কুচিয়ামারা কলেজগেট এলাকায় গতকাল দুপুরে ট্রাকচাপায় পথচারী সুমন মিয়া (২৭) নিহত হন। তার বাড়ি ঢাকার লালবাগে।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামে প্রতিদিনের মতো শুক্রবার বিকেলে হাঁটতে বের হয়ে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় মারা যান ফিরোজা বেওয়া (৫০) নামে এক বিধবা।
বগুড়ার শেরপুরে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের উপজেলা পরিষদের সামনে শুক্রবার রাতে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী এনজিওকর্মী দিলীপ কুমার রায় (৩৫) মারা যান। তার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গাড়িবাকসি গ্রামে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার চন্দরিয়া-গোগড় পাকা সড়কের রনশিয়া এলাকায় মোটরসাইকেলর সঙ্গে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলির ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী আজহারুল (১৭) নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন তার আরও দুই বন্ধু।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



