
স্পোর্টস ডেস্ক : ‘চীনের দুঃখ হোয়াংহো’ – এটা তো আপনারা অনেকেই জানেন। এখন যদি আপনাদের প্রশ্ন করা হয়, ক্রিকেটে পাকিস্তানের ‘দুঃখ’ কারা? উত্তরে অনেকেই অস্ট্রেলিয়ার নাম বলবেন। আসলেই তাই। ১৯৮৭ এর লাহোর থেকে ২০২১ এর দুবাই- বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়া মুখোমুখি হয়েছে পাঁচবার। আর প্রতিবারই পরাজিত দলটি হচ্ছে পাকিস্তান।
১। ৪ নভেম্বর,১৯৮৭; বিশ্বকাপ প্রথম সেমিফাইনাল, ভেন্যু: গাদ্দাফি স্টেডিয়াম, লাহোর,পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া: ২৬৭/৮(৫০), পাকিস্তান: ২৪৯/১০(৪৯); ফল: অস্ট্রেলিয়া ১৮ রানে জয়ী। অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান প্রথম নকআউটে মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৮৭ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। স্বাগতিক হয়ে প্রথমবারই হতাশায় পুড়তে হয় পাকিস্তানকে।
লাহোরে টস জিতে ফিল্ডিং নেয় অ্যালান বোর্ডারের অস্ট্রেলিয়া। ওপেনার জিওফ মার্শ ও তিন নম্বরে নামা ডিন জোনসের সঙ্গে দুটি পঞ্চাশোর্ধ্ব জুটি গড়ে দলকে ভালোই এগিয়ে নিচ্ছিলেন ডেভিড বুন (৯১ বলে ৬৫)। তবে দলীয় ১৫৫ রানে বুনের বিদায়ের পর ইমরান খানের (১০-১-৩৬-৩) দুর্দান্ত বোলিংয়ে অজি ইনিংসের রানের চাকা শ্লথ হয়ে যায়।
৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৬৭ রান করে অস্ট্রেলিয়া। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে পাকিস্তান ৩৮ রানেই হারায় ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম তিন ব্যাটার। চতুর্থ উইকেট জুটিতে জাভেদ মিয়াঁদাদ (১০৩ বলে ৭০) ও ইমরান (৮৪ বলে ৫৮) ১১২ রান করে সামাল দেন প্রাথমিক ধাক্কা।
এরপরই যেন ইমরানের ‘ক্যাপ্টেন লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট’- ভুল প্রমাণিত হওয়া শুরু করে। অজি পেস বোলার ক্রেইগ ম্যাকডারমটের (১০-০-৪৪-৫) বিধ্বংসী বোলিংয়ে এক ওভার আগেই স্বাগতিকরা গুটিয়ে যায় ২৪৯ রানে। ১৮ রানে জিতে ‘৭৫ এর প্রথম বিশ্বকাপের পর দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠে অস্ট্রেলিয়া।
২। ২০ জুন, ১৯৯৯; বিশ্বকাপ ফাইনাল; ভেন্যু: লর্ডস, ইংল্যান্ড, পাকিস্তান: ১৩২/১০(৩৯), অস্ট্রেলিয়া: ১৩৩/২(২০.১); ফল: অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে জয়ী। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে উড়ন্ত গতিতে ছুটছিল পাকিস্তান। গ্রুপ পর্বে লিডসে অস্ট্রেলিয়াকেও ১০ রানে হারিয়েছিল তারা। অনেক ক্রিকেট ভক্তই তখন পাকিস্তানের ক্যাবিনেটে দ্বিতীয় শিরোপা দেখার অপেক্ষায় ছিলেন।
তবে স্টিভ ওয়াহ যেন কিছুতেই ‘লিডস ম্যাচটি’র কথা ভুলতেই পারছিলেন না। লর্ডসে দিলেন ‘ওস্তাদের শেষ মাইর।’ শেন ওয়ার্নের ঘূর্ণিতে (৯-১-৩৩-৪) টস জিতে আগে ব্যাটিং করা পাকিস্তান ৪০ ওভারের আগেই গুটিয়ে যায় ১৩২ রানে। ১৩৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ঝড়ো ফিফটিতে (৩৬ বলে ৫৪) অর্ধেক ওভার শেষ হওয়ার আগেই অস্ট্রেলিয়া চলে যায় জয়ের বন্দরে। দীর্ঘ এক যুগ পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতে অস্ট্রেলিয়া।
৩। ১৪ মে, ২০১০; বিশ্বকাপ দ্বিতীয় সেমিফাইনাল, ভেন্যু: গ্রস আইলেট, সেন্ট লুসিয়া, পাকিস্তান: ১৯১/৬, অস্ট্রেলিয়া: ১৯৭/৭(১৯.৫); ফল: অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেটে জয়ী। লাহোর, লর্ডস ঘুরে এবারের ভেন্যু ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেন্ট লুসিয়া। পাকিস্তানের এবারের লক্ষ্য ছিল টানা তিনটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা।
গ্রস আইলেটে এদিন অস্ট্রেলিয়ার থেকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ পায় পাকিস্তান। আকমল ব্রাদার্সের জোড়া ফিফটিতে (কামরান: ৩৪ বলে ৫০, উমর: ৩৫ বলে ৫৬*) ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ১৯১ রান করে পাকিস্তান। ১৯২ রান তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানি বোলারদের আগুনে বোলিংয়ে ‘চোখে সর্ষেফুল’ দেখতে থাকেন অজি ব্যাটাররা।
সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মিছিলে মোহাম্মদ আমির, সাঈদ আজমলদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মাইক হাসি। ফর্মে থাকা আজমলকে ইনিংসের শেষ ওভারে ৬, ৬, ৪, ৬ মেরে পাকিস্তানের ‘হাসি’ কেড়ে নেন ‘মিস্টার ক্রিকেট’। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে অস্ট্রেলিয়া।
৪। ২০ মার্চ, ২০১৫; বিশ্বকাপ তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনাল; ভেন্যু: অ্যাডিলেড ওভাল, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান:২১৩/১০(৪৯.৫), অস্ট্রেলিয়া: ২১৬/৪ (৩৩.৫); ফল: অস্ট্রেলিয়া ৬ উইকেটে জয়ী। ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’ – বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনের এই নীতিমালাই যেন সেদিন অ্যাডিলেডে বাস্তব প্রমাণিত হলো ওয়াহাব রিয়াজের কাছে। তাও একবার না, হয়েছে দু’বার।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ১৭তম ওভারের প্রথম বলের ঘটনা। নিজের ব্যক্তিগত আগের চার ওভারে দুই উইকেট নেওয়া রিয়াজের এটা ছিল পঞ্চম ওভার। ১৬.১ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর হতে পারত ৪ উইকেটে ৮৩। কিন্তু ফাইন লেগে শেন ওয়াটসনের সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন রাহাত আলি। এরপর সুযোগের সদ্ব্যবহার করে অজি অলরাউন্ডার সাবলীলভাবে তুলে নেন নিজের ৩৩তম ওয়ানডে ফিফটি।
এরপর স্বাগতিকদের জয়ের জন্য যখন দরকার ৬০ রান, তখন ওয়াহাবের বলে আরও একবার ক্যাচ মিস হয়। ২৯ তম ওভারের দ্বিতীয় বলে এবার থার্ডম্যানে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে জীবন দেন সোহেল খান। সুযোগ পেয়ে ম্যাক্সওয়েল আরও ভয়ঙ্কর বনে যান। ‘জীবন’ পাওয়া দুই অজি ব্যাটার ওয়াটসন (৬৬ বলে ৬৪) ও ম্যাক্সওয়েল (২৫ বলে ৪৪) দায়িত্ব নিয়ে অজিদের নিয়ে যান সিডনির সেমিফাইনালে।
৫। ১১ নভেম্বর, ২০২১; টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দ্বিতীয় সেমিফাইনাল, ভেন্যু: দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান: ১৭৬/৪ (২০), অস্ট্রেলিয়া: ১৭৭/৫ (১৯); ফল: অস্ট্রেলিয়া ৫ উইকেটে জয়ী। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার জন্য পাকিস্তান যেন অস্ট্রেলিয়ার ‘মই’। এবারও সেই মই বেয়ে ফাইনালে উঠে গেলো তারা।
সেন্ট লুসিয়ার মতো এদিনও দুবাইয়ে টস হেরে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ পেয়েছিল পাকিস্তান। মোহাম্মদ রিজওয়ান (৫২ বলে ৬৭) ও ফাখর জামানের (৩২ বলে ৫৫*) জোড়া ফিফটিতে ২০ ওভার শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ১৭৬।
১৭৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে সাদাব খানের ঘূর্ণিতে (৪-০-২৬-৪) ১২.২ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ৯৬। ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ম্যাথ্যু ওয়েড (১৭ বলে ৪১) ও মার্কাস স্টয়েনিজ (৩১ বলে ৪০) বাউন্ডারি, সিঙ্গেলস, ডাবলস নিয়ে স্বাভাবিকভাবে দলকে জয়ের বন্দরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
নাটকীয়তা চরমে ওঠে ১৯তম ওভারে। শাহিন শাহ আফ্রিদির তৃতীয় বলে তুলে মেরেছিলেন ওয়েড। ডিপ মিড উইকেটে সহজ ক্যাচ ফস্কান হাসান আলি। এরপরই ‘ক্যাচ মিস, ম্যাচ মিস’- পাকিস্তানকে এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েন ওয়েড।
চতুর্থ বলে শাহিনের ১৪৫ কিলোমিটারের ইয়র্কারকে ফাইন লেগের ওপর দিয়ে স্কুপ করে ‘দুঃসাহসী ছক্কা’ হাঁকান ওয়েড। পঞ্চম বলে পাকিস্তানি বাঁহাতি পেসারের ‘হিট মি ডেলিভারি’ ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে সীমানাছাড়া করেন অজি উইকেটরক্ষক ব্যাটার।
ওয়েডের মাথায় হয়তো তখন আগেরদিনের আবুধাবির ‘কিউই ফর্মুলা’ কাজে লাগানোর চিন্তা কাজ করছিল। ওভারের শেষ বলে উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ রিজওয়ানের মাথার ওপর দিয়ে আবারও ছক্কা মেরে শাহিনকে ১১ বছরের পুরনো সাঈদ আজমলের স্মৃতি মনে করিয়ে দিলেন ওয়েড। লিখেছেন : অয়ন রায় অঙ্কন
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


