জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। কিন্তু শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা কখনোই থামাতে পারেনি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার আয়েশা আক্তারকে। দুই হাত ছাড়াই পা দিয়ে লেখাপড়া করে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। এখন তার একমাত্র স্বপ্ন—একটি সরকারি চাকরি পেয়ে নিজের ও মায়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া।

১৯৯৫ সালে সাঘাটা ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া আয়েশা চার বোনের মধ্যে তৃতীয়। দেড় বছর আগে বাবাকে হারানোর পর বর্তমানে মাকে নিয়েই তার ছোট সংসার। জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকলেও ছোটবেলা থেকেই ছিল পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ।
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা তাকে সার্কাসে দেওয়ার কথা ভাবলেও নিজের শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন আয়েশা। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে পায়ের সাহায্যে লিখেই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি এবং সম্প্রতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দুই হাত না থাকলেও দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজই পা দিয়ে করেন আয়েশা। পায়ের আঙুল দিয়ে চাল ঝাড়েন, বটিতে তরকারি কাটেন এবং খাতায় লিখে নিজের কাজ চালিয়ে যান। তার এই সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাস এলাকার মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, শিক্ষাজীবনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করলেও বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটই আয়েশার সবচেয়ে বড় বাধা। একটি চাকরি তার জীবন পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
প্রতিবেশী বিলা বেগম বলেন, অনেকেই এসে ভিডিও করে, ছবি তোলে; কিন্তু বাস্তবে মেয়েটির জন্য তেমন কেউ এগিয়ে আসে না। অথচ সে পা দিয়েই সংসারের সব কাজ করে। একটি চাকরি পেলে তার জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেত।
আয়েশার চাচা জহুরুল ইসলাম বলেন, জন্মগত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কখনো হার মানেনি মেয়েটি। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ করে দেয়, তাহলে সে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে।
মা সাজেদা বেগম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, জন্মের পর অনেকেই তার মেয়েকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো মেয়েকে বোঝা মনে করেননি। আজ পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস করায় তিনি গর্বিত। এখন তার একটাই চাওয়া—মেয়ের জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা বলেন, “আমি ভিক্ষা চাই না, আমি আমার যোগ্যতায় একটি চাকরি চাই। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। সরকার যদি আমার মতো শিক্ষিত ও অসহায় মানুষের দিকে নজর দেয়, তাহলে আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের পাশে থাকতে পারব।”
সাঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট বলেন, আয়েশার জীবনসংগ্রাম সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তার মতো মেধাবী ও পরিশ্রমী একজন মানুষের পাশে সমাজের সবাইকে দাঁড়ানো উচিত।
এদিকে সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর জানিয়েছেন, আয়েশার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ঈদের সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হয়েছে এবং সরকারি সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
দুই হাত ছাড়াই জীবনের প্রতিটি বাধাকে জয় করে শিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপগুলোর একটি অতিক্রম করেছেন আয়েশা আক্তার। এখন তার অপেক্ষা শুধু একটি সুযোগের—যে সুযোগ তাকে স্বাবলম্বী করবে এবং তার দীর্ঘ সংগ্রামের সার্থকতা এনে দেবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



