নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে—যা চলতি মৌসুমে সর্বনিম্ন। হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও খেটে খাওয়া মানুষ। একই সঙ্গে কৃষি প্রধান এ অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

ঘন কুয়াশা ও উত্তরের হিমেল বাতাসে সকাল পর্যন্ত ঢাকা থাকছে চারপাশ। দিনের বেলাতেও অনেক সময় সূর্যের দেখা মিলছে না। কুয়াশার কারণে ছোট ও মাঝারি যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে শিশু ও বয়স্করা। চিকিৎসকরা জানান, শীতজনিত কারণে জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেশি দেখা দিচ্ছে। শীতের কারণে অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারছে না, বয়স্করা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
২৪ ঘণ্টায় তাপমাত্রা কমেছে সাড়ে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস
নওগাঁর বদলগাছী কৃষি ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন তাপমাত্রা ছিল ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তাপমাত্রা প্রায় সাড়ে চার ডিগ্রি কমে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে কয়েকগুণ।
শহরের চকবাড়িয়া এলাকার রিকশাচালক মজিদ বলেন, শীতে শরীর অবশ হয়ে আসে। মানুষ ঘর থেকে কম বের হওয়ায় আয় নেই। তবুও পরিবার চালাতে বাধ্য হয়ে রিকশা চালাচ্ছি।
দিনমজুর আব্দুল জলিল বলেন, ভোরে কাজে বের হতে পারছি না। শীতের কারণে কাজ কমে গেছে, সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার ৬০০ পিস কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আরও প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার পিস কম্বল বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। শীতের তীব্রতা বাড়লে বিতরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
শীতের প্রভাব পড়েছে কৃষিতে, ফসলের ক্ষতি
শীতের প্রভাব পড়েছে জেলার প্রধান অর্থনৈতিক খাত কৃষিতেও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ৯ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ৯ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষকেরা জানান, প্রচণ্ড শীত ও দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশার কারণে বোরো বীজতলায় ‘কোল্ড ইনজুরি’ দেখা দিয়েছে। এতে চারা হলুদ বা লালচে হয়ে পচে যাচ্ছে। চারা রক্ষায় পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখা হচ্ছে।
মান্দা উপজেলার গনেশপুর গ্রামের কৃষক কাজী আবুল কাসেম বলেন, শীত আর কুয়াশা এত বেশি যে বীজতলা খোলা রাখলে সব নষ্ট হয়ে যেত। পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরও অর্ধেক চারা নষ্ট হয়ে গেছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার সরাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন,ঘন কুয়াশায় বীজতলার প্রায় ৮০ শতাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে। ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। নতুন করে চারা লাগালে সময় ও আবহাওয়ার কারণে এবার ইরি ধান আবাদ সম্ভব হবে না।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ হুমায়রা মন্ডল বলেন, এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কারণ অধিকাংশ কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা অতিরিক্ত বীজতলা তৈরি করে থাকেন। কোল্ড ইনজুরি থেকে বীজতলা রক্ষায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা, রাতের বেলায় হালকা পানি দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
হাড়কাঁপানো শীত ও ঘনকুয়াশায় স্থবির জয়পুরহাট
নওগাঁর বদলগাছী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হামিদুল ইসলামের বরাত দিয়ে জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, বুধবার ভোর ৬টায় জয়পুরহাটসহ পাশের নওগাঁর বদলগাছীতে বছরের সবচেয়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকাল ৯টায়ও তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকে। এ বছরের তাপমাত্রা আজ সর্বনিম্ন। তবে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রোদের দেখা মিলেছে।
গত কয়েক দিন ধরে ঠান্ডা ও ঘনকুয়াশায় জয়পুরহাটের পুরো এলাকা স্থবির হয়ে পড়েছে। সকালেও ছিল ঠান্ডার সাথে ঘন কুয়াশা। হঠাৎ করে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দেখা মিলে রোদের। তবে হাড়কাঁপানো শীত জেলার সর্বত্রই জেঁকে বসেছে। বেড়েছে শীতের প্রকোপ। সকালে মহাসড়কে যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করেছে। জীবিকার প্রয়োজনে রোদের দেখা পাওয়ার পর বের হচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষ।
বাড়ছে শীতজনিত রোগ
শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতজনিত রোগ। হাসপাতালগুলোতে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানু চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে।
জয়পুরহাট ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনে তুলনায় রোববার রাত থেকে হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়েছে। নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, কয়েকদিনের প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শীত বাড়ায় শিশু ও বয়স্কদের ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ক্ষেতলাল পৌর শহরের বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, রোদ ওঠলে কি হবে, ঠান্ডায় বাড়ি থেকে বের হওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে। হাত-পা ঠিকমতো কাজ করছে না। জীবিকার তাগিদে বের হতে হয়েছে।
সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে ভ্যাটের পাওনা টাকা : এনবিআর
জয়পুরহাট-বগুড়া মহাসড়কে ট্রাক চালক আপেল বলেন, কুয়াশা কমে না। সকালেও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে হয়েছে। হেড লাইটের আলোতে ঠিকমতো দেখাও যায় না। এ অবস্থায় খুলনা থেকে জয়পুরহাট পর্যন্ত আসছি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


