রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে গত বুধবার বিকেলে পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায় ‘সৌহার্দ্য’ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। তবে এই শোকাবহ ঘটনার সমান্তরালে একটি যান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। প্রত্যক্ষদর্শী এবং বেঁচে ফেরা যাত্রীদের দাবি বাসের জানালার ঠিক মাঝখানে থাকা একটি মাত্র লোহার রড বা পাইপই মূলত অনেকের বাঁচার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।

Rod

Advertisement

দুর্ঘটনা কবলিত বাসটি যখন নদীর গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন অনেক যাত্রীই জানালার কাঁচ ভেঙে বের হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জানালার মাঝ বরাবর আড়াআড়িভাবে লাগানো লোহার পাইপটির কারণে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের পক্ষে সেই সরু ফাঁক দিয়ে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয়রা জানান, জানালার রড না থাকলে নিহতের সংখ্যা অর্ধেকেরও কম হতে পারত।

এ বিষয়ে লেখক ও ধর্মীয় আলোচক মুফতি নাজমুল ইসলাম কাসেমী নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখেন, ‘হয়তো অনেকেই জানালা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এই পাইপটার জন্য পারেনি। জি, এটাই বাস্তবতা। জাস্ট একটা পর্দা টানানোর জন্য বাসে জানালার ঠিক মাঝামাঝি এরকম একটা পাইপ দেওয়া থাকে। অথচ চাইলে ভিন্নভাবে এই পর্দার সিস্টেম করা যায়! বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘আমি বাসে উঠে যখন এই পাইপটা দেখি, মনের মাঝে এটাই আসে যদি বাস কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়, আমি বের হব কীভাবে?’

জানালার মাঝখানে যে রডটি দেখা যায়, সেটি আসলে বিআরটিএ-এর অনুমোদিত কোনো নকশা বা ফিটনেসের অন্তর্ভুক্ত বিষয় নয়। এটি মূলত বাস মালিক পক্ষ বা সংশ্লিষ্টরা ব্যবহার করে থাকেন; যাতে যাত্রীরা অসাবধানতাবশত জানালার বাইরে মাথা বের করতে না পারেন। অর্থাৎ, এটি তারা যাত্রীদের এক ধরনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই যুক্ত করেন।—ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ অহিদুর রহমান, সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি

পাইপ মৃতুর প্রধান কারণ উল্লেখ করে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) মুহাম্মদ রেজিঈ রাফিন সরকার নিজের ফেসবুক একাউন্টে লেখেন, ‘এই পাইপ বাসে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ। দৌলতদিয়া ঘাটে নদীতে পড়ে যাওয়া বাসে মৃতের সংখ্যা অনেক কম হতো শুধু এই পাইপ না থাকলে। সেদিন বাসটি নদীতে ডুবে যাওয়ার পর অনেক যাত্রী জানালার এই প্রতিবন্ধকতার জন্য বের হতে পারেনি—এটা নিশ্চিত।’

তিনি বলেন, ‘বিআরটিএ থেকে এই পাইপ থাকলে বাসের ফিটনেস বাতিল করা হবে মর্মে প্রজ্ঞাপন জারি করার পর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা দরকার। তাহলে দুই দিনের মধ্যে সকল বাস নিজ দায়িত্বে এই মৃত্যুফাঁদ খুলে ফেলবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বিভাগের রাজবাড়ী জেলার সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মুহাম্মদ অহিদুর রহমান বলেন, জানালার মাঝখানে যে রডটি দেখা যায়, সেটি আসলে বিআরটিএ-এর অনুমোদিত কোনো নকশা বা ফিটনেসের অন্তর্ভুক্ত বিষয় নয়। এটি মূলত বাস মালিক পক্ষ বা সংশ্লিষ্টরা ব্যবহার করে থাকেন যাতে যাত্রীরা অসাবধানতাবশত জানালার বাইরে মাথা বের করতে না পারেন। অর্থাৎ, এটি তারা যাত্রীদের এক ধরনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই যুক্ত করেন।

দুর্ঘটনার সময় এই রডের কারণে যাত্রীদের বের হতে বাধা সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য ভাইরাল হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সব সময় যে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে তা নয়। সাধারণত জানালায় রড থাকলেও এর উপরে ও নিচে বের হওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকে। তবে বাসটি যেহেতু সরাসরি পানিতে পড়ে গিয়েছিল, সেই আতঙ্কিত মুহূর্তে যাত্রীদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করা বা বের হওয়া কঠিন ছিল।’

ভবিষ্যতে এ ধরনের রড বা বাসের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে বিআরটিএ কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, সে বিষয়ে সহকারী পরিচালক বলেন, ‘যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। আপনি যে বিষয়টি (রডের কারণে বের হতে না পারা) উত্থাপন করেছেন, এটি আমি আমাদের আগামী মিটিংয়ে টেকনিক্যাল কমিটির সামনে উপস্থাপন করব। কারিগরি কমিটি এ বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, ‘বাসের জানালার মাঝখানে যে রড বা পাইপটি লাগানো হয়, সেটি বৈজ্ঞানিক বা কারিগরি কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি মূলত বাসের ভেতরে পর্দা টানানো কিংবা যাত্রীরা যাতে বাইরে হাত বা মাথা বের করতে না পারে, সেই যুক্তিতে লাগানো হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় এই রডটি একটি ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে কাজ করে।

তিনি বলেন, যেকোনো গণপরিবহনের নকশা এমন হওয়া উচিত যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে (যেমন—আগুন লাগলে বা বাস পানিতে পড়ে গেলে) যাত্রীরা দ্রুত বের হতে পারেন। জানালার মাঝখানে এই স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা থাকার ফলে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের পক্ষে জানালা দিয়ে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। দৌলতদিয়া ঘাটের ঘটনায় আমরা দেখলাম, জানালা দিয়ে বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই রডের কারণে অনেক যাত্রী ভেতরে আটকা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, বিআরটিএ-এর উচিত বাসের ফিটনেস পরীক্ষার সময় এই বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করা। জানালার রড বা এ জাতীয় কোনো অতিরিক্ত কাঠামো যা যাত্রীদের জরুরিভাবে বের হতে বাধাগ্রস্ত করে, তা অপসারণ না করা পর্যন্ত কোনো বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘একই সাথে পন্টুনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। আনগার্ডেড বা কম উচ্চতার গার্ড রেলিং এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন রেয়ার ইভেন্ট ঠেকাতে হাইরাইজ গার্ড দেওয়ার এখনই সময়। পন্টুনের রেলিং যদি আরও এক-দেড় হাত উঁচু হতো, তবে বাসটি আটকে যেত। তাই এইদিকে মনযোগ বাড়ানো দরকার সরকারের।’

প্রসঙ্গত, বুধবার (২৫ মার্চ) বিকাল সোয়া ৫টার দিকে ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি পড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সোয়া ৫টার দিকে বাসটি নদীতে পড়ে গেলেও দৌলতদিয়া ২ নম্বর ফেরিঘাটে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা রাত সাড়ে ৯টার দিকে উদ্ধারকাজ শুরু করে। তবে এই পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

সৌহার্দ্য পরিবহনের কুমারখালী পৌরবাস টার্মিনালে অবস্থিত বাসটির কাউন্টার মাস্টার তন্বয় শেখ বলেন, দুপুরে বাসটিতে ছয় জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায়। এরপর খোকসা থেকে সাত জন, মাছপাড়ায় চার জন, পাংশায় ১৫ জন ওঠেন। ইঞ্জিন কাভারেও চার জন যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া গোয়ালন্দ ঘাটে কয়েকজন যাত্রী ওঠেন। চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারীসহ বাসে কমপক্ষে ৫০ জন ছিলেন।

সূত্র ও ছবি : দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.