ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ‘জয়’ এই বার্তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবারই তুলে ধরেছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ভেনেজুয়েলার মতো এমন কোনো রাষ্ট্র নয়, যাকে সহজ রাজনৈতিক চাপ বা সীমিত সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরাস্ত করা যাবে। রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে আদর্শিকভাবে সংগঠিত ও দীর্ঘদিনের সংকটে অভ্যস্ত ইরানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কোনো সহজ কিংবা দ্রুত সমাধানের পথ খোলা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো হলে তেহরান শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক পাল্টা জবাব দিতে পারে। ২০২০ সালে শীর্ষ সামরিক নেতা কাসেম সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড কিংবা গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর যে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, ভবিষ্যতে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে তথাকথিত ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ চালালেও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে দেশটির অভ্যন্তরে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।
স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বারবারা স্লাভিন বলেন, ‘সব বিকল্পই বিপজ্জনক। একের পর এক পদক্ষেপের পরিণতি কী হবে, তা অনুমান করা কঠিন। শাসনব্যবস্থা যদি মনে করে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে তারা ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।’
চলতি বছরের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ জোরালো হলে ট্রাম্প হুমকি দেন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে। ২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রস্তুত ও সজ্জিত’। পরবর্তী দুই সপ্তাহে তিনি এই হুমকি বারবার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানান।
তবে পরে তার বক্তব্যে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়ালেও এবং দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও ট্রাম্প বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলার জবাবেই পাল্টা গুলি চালানো হয়েছে এমন দাবি করেছে তেহরান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি আপাতত কিছুটা শান্ত হলেও সংকট শেষ হয়নি। আবারও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি পুরোপুরি বাতিল করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প অতীতে আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি হত্যা, সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড কিংবা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো পদক্ষেপ নিয়ে গর্ব করেছেন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু ইরানের বাস্তবতা ভিন্ন।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, ‘এটি ভেনেজুয়েলা নয়। এখানে দ্রুত ও সহজ কোনো সমাধান নেই। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে বিপুল সামরিক শক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন।’
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর বিশ্লেষক নায়সান রাফাতির মতে, যদি ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হামলা বৃহত্তর অভিযানের সূচনা, তাহলে তেহরান আরও মরিয়া হয়ে বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কূটনৈতিক পথও আলোচনায় রয়েছে। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, ইরান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করলে কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব।
তবে পারসির মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ চাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ ছাড়া কূটনীতি সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।’
আরও পড়ুন : কিছু ভুয়া খবর দেখলাম : তাহসান
সব মিলিয়ে আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামরিক হোক বা কূটনৈতিক ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে সহজ কোনো জয়ের পথ নেই।
সূত্র: আল-জাজিরা
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


