আবির হোসেন সজল : রংপুর অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আয়োজন সিন্দুরমতি তীর্থধাম মেলা। তিন শতাধিক বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসা এই মেলা লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের সিন্দুরমতি গ্রামে অবস্থিত সিন্দুরমতি দিঘির পাড়ে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়। চৈত্র মাসের রাম নবমী তিথীকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ মেলায় এ বছরও শুক্রবার ভোর থেকে হাজার হাজার তীর্থযাত্রীর ঢল নামে।

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আগত ভক্তরা সিন্দুরমতি দিঘিতে পবিত্র স্নান করেন। স্নানের মাধ্যমে ‘পুণ্যলাভ ও মানসিক প্রশান্তি’ কামনা করে তারা ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রার্থনায় মগ্ন হন। মেলাকে ঘিরে পুরো এলাকা পরিণত হয় উৎসবমুখর এক ধর্মীয় মিলনমেলায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিঘির পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একাধিক প্রাচীন মন্দির—সিন্দুরমতি মন্দির, দুর্গা মন্দির, শিব মন্দির, রাম মন্দির, কৃষ্ণ মন্দির, কালী মন্দির ও রাধাগোবিন্দ মন্দির। এসব মন্দিরে দিনভর পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় আচার পালিত হয়।
এই মেলার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ‘সখা-সখি’ সম্পর্ক স্থাপন। শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, মেলায় আগত অনেকেই পারস্পরিক বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন, যা সামাজিকভাবে ‘আপনজন’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পাশাপাশি, সিঁদুর কেনা ও তা অন্যদের মধ্যে বিতরণ করাও এ মেলার একটি পুরনো ও তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহ্য।
সিন্দুরমতি তীর্থধাম মূলত সিন্দুরমতি দিঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি পবিত্র তীর্থস্থান। ১৯৭৫ সালে সরকারি উদ্যোগে দিঘিটি সংস্কারের সময় প্রাচীন যুগের বহু মুদ্রা ও প্রত্নবস্তু উদ্ধার হয়, যা বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
লোককথা অনুযায়ী, জমিদার রাজ নারায়ণ চক্রবর্তী সন্তান লাভের আশায় এই দিঘি খনন করেন। পরবর্তীতে তার দুই কন্যার জন্ম হয়—সিন্দুর ও মতি। তবে দিঘিতে পানি স্থায়ীভাবে না থাকায় তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাম নবমীর দিন দিঘির মাঝখানে পূজার আয়োজন করেন। পূজার এক পর্যায়ে হঠাৎ প্রবল বেগে পানি উঠে দিঘি পূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় উপস্থিত সবাই পাড়ে উঠতে পারলেও সিন্দুর ও মতি পানিতে তলিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাদের দেবত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই থেকেই দিঘির নাম হয় ‘সিন্দুরমতি’ এবং গ্রামটির নামকরণও হয় একই নামে।
রংপুরের বদরগঞ্জ থেকে আসা ৭৫ বছর বয়সী তীর্থযাত্রী সচিন চন্দ্র বর্মণ বলেন, “প্রায় ৫০ বছর ধরে আমি এই মেলায় আসছি। সিন্দুরমতি দিঘিতে স্নান করলে আত্মিক শান্তি ও পুণ্য লাভ হয়।”
কুড়িগ্রামের রাজারহাট থেকে আগত অনিতা রানী (৫০) বলেন, “আমরা প্রতিবছর এখানে এসে সিঁদুর কিনে অন্যদের মধ্যে বিতরণ করি। এটি আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও পুণ্য অর্জনের একটি অংশ।”
লালমনিরহাটের আদিতমারী থেকে আগত রমনী চন্দ্র সেন (৬৫) জানান, শৈশবকাল থেকেই তিনি এ মেলায় আসছেন। “এটি আমাদের কাছে একটি পবিত্র তীর্থস্থান। এখানে স্নান ও পূজার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়,” বলেন তিনি।
পুরোহিত শঙ্কর চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে সিন্দুরমতি তীর্থধাম মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। “রাম নবমীর তিথীতে এখানে এলে ভক্তরা ভগবানের আশীর্বাদ লাভ করেন,” বলেন তিনি।
লালমনিরহাট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হিরালাল রায় জানান, তিন শতাধিক বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই মেলা রংপুর অঞ্চলের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। “দিঘির পাড়ের মন্দিরগুলোতে সারা বছর নিয়মিত পূজা-অর্চনা হয়,” বলেন তিনি।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
লালমনিরহাট সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, “মেলায় আগত তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


