ঢালিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী তমা মির্জা। একসময় নাচ দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। আজ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ভেঙে, গড়ে, আবার নতুন করে আবিষ্কার করার যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; তমা যেন সেটাকেই নিজের অভিনয়জীবনের মূল দর্শন বানিয়ে নিয়েছেন। অভিনয় দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই যাত্রায় তিনি এখন এক ভিন্ন তমা, পরিণত, আত্মবিশ্বাসী এবং গল্পনির্ভর সিনেমার নির্ভরযোগ্য মুখ।

২০১৫ সালে শাহনেওয়াজ কাকলী পরিচালিত ‘নদীজন’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এই অভিনেত্রী। কিন্তু পুরস্কারপ্রাপ্তির পরও একটা দীর্ঘ সময় তিনি আটকে ছিলেন গতানুগতিক নায়িকা চরিত্রে। তখন হয়তো অনেকেই ভেবেছিলেন, তমার সম্ভাবনা এখানেই থেমে যাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি নিজেই।
রায়হান রাফীর ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ ওয়েব ফিল্মে তমা নিজেকে ভেঙে একেবারে নতুন রূপে হাজির হন। চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব, যন্ত্রণা আর সংবেদনশীলতা– সবকিছু মিলিয়ে দর্শক প্রথমবার নতুন এক তমাকে চিনতে শুরু করে। এরপর একে একে ‘৭ নাম্বার ফ্লোর’, ‘ফ্রাইডে’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘আমলনামা’ এবং সর্বশেষ শিহাব শাহীনের ‘দাগি’– প্রতিটি কাজেই তমা দেখিয়েছেন চরিত্রনির্ভর অভিনয়ের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা। বিশেষ করে দাগি সিনেমায় তাঁর অভিনয় সমালোচক ও দর্শক দুই পক্ষের কাছেই প্রশংসিত হয়েছে।
অনেকের মতে, এই সিনেমাটিই তমার অভিনয়জীবনে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। এখানে তিনি শুধু অভিনয় করেননি, চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। নতুন বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালেও তমা মির্জার সামনে অপেক্ষা করছে ব্যস্ত সময়। নতুন বছরে তাঁকে দেখা যাবে দুটি নতুন সিনেমায়। এর একটি পরিচালনা করছেন গোলাম সোহরাব দোদুল, নাম জলযুদ্ধ। এই ছবিতে মোশাররফ করিমের বিপরীতে অভিনয় করবেন তমা।
অন্যদিকে হাসান মোরশেদের পরিচালনায় আরও একটি সিনেমায় তাঁর সহশিল্পী শরীফুল রাজ। যদিও দ্বিতীয় ছবিটির নাম এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি, তমা জানিয়েছেন, দুটি গল্পই তার ভালো লেগেছে এবং একজন অভিনেত্রী হিসেবে এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে তিনি আগ্রহী। নতুন পরিচালক, নতুন সহশিল্পী ও নতুন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান– সব মিলিয়ে তমার জন্য এটি হতে যাচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তমা মির্জা বলেন, ‘নতুন সিনেমার বিষয়ে এখনই কিছু বলতে চাই না। তবে সুখবর আসছে। কয়েকজন নির্মাতা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। এর মধ্য থেকে দুটি ছবিতে কাজ করব। পাকাপাকি হলে সবাই জানতে পারবেন।’
শুধু দেশেই নয়, ওপার বাংলাতেও কাজ করে নিজের অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছেন তমা। অঞ্জন দত্ত পরিচালিত দুই বন্ধু ওয়েব সিরিজের শুটিং তিনি শেষ করেছেন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায়। এখনও মুক্তির অপেক্ষায় থাকা এই সিরিজটি নিয়েও আশাবাদী অভিনেত্রী। অঞ্জন দত্তের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তমা জানিয়েছেন, ‘কলকাতার কাজের পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও টিমওয়ার্ক তাঁকে মুগ্ধ করেছে এবং একজন অভিনেত্রী হিসেবে তিনি সেখানে অনেক কিছু শিখেছেন।
ছবির মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কাজটি কবে মুক্তি পাবে আমি আসলে নিজেও জানি না। অনেকেই আমার কাছে জানতে চাইছেন, সিনেমাটি কবে মুক্তি পাবে। মোটা দাগে বলতে পারি, খুব ভালো একটি কাজ হয়েছে। যখনই মুক্তি পাক দর্শক পছন্দ করবেন, তাদের ভালো লাগবে।
কাজের বাইরে তমা মির্জা একেবারেই আলাদা মানুষ। এখন তিনি পরিবারকে সময় দিচ্ছেন। গান শোনা, বই পড়া, সিনেমা দেখা আর রান্না– এই নিয়েই তাঁর অবসর। রান্নাকে তিনি শিল্পের মতোই দেখেন।
ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েন, সম্পর্কের ভাঙাগড়া কিংবা ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি–সবকিছুই দেখেছেন তমা। কিন্তু চুপ থাকাই তাঁর স্বভাব। তাঁর ভাষায়, চুপ থাকা মানেই না বোঝা নয়; বরং অনেক কিছু দেখেও প্রতিক্রিয়া না দেখানোর মধ্যেই তিনি নিজের শক্তি খুঁজে পেয়েছেন। সিনেমার মূলধারায় নিজেকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া তমা মির্জার এই যাত্রা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, সময় নিয়ে নিজেকে গড়ে তুললে, গল্প আর চরিত্রকে গুরুত্ব দিলে একজন অভিনয়শিল্পী সত্যিই বদলে যেতে পারেন।
আজকের তমা আর কেবল একজন অভিনেত্রী নন, তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক শিল্পী– যাঁর সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় গল্প, আরও গভীর চরিত্র আরও উজ্জ্বল সময়। এমনটিই মনে করছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা।
দেখতে দেখতে অভিনয় ক্যারিয়ারের ১৫ বছর পার করেছেন। পেছনে ফিরে তাকালে কী দেখতে পান? তমার উত্তর ‘জীবনের দিনগুলো রঙিনই তো মনে হয়। ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারের উন্নতি হয়েছে। যেভাবে একটি ঘর তৈরি হয়। সবাই সুখেশান্তিতে থাকার স্বপ্ন দেখি। আমার ক্যারিয়ারটা সে রকম। একটা ঘর হয়েছে। ঘরটায় আরামে থাকতে চাই। ক্যারিয়ারটা ধরে রাখতে চাই। প্রতিদিনই শিখছি। প্রতিদিনই আমার জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা। আমার জন্য চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
১৫ বছরের ক্যরিয়ারে আমার কোনো দুঃখবোধ নেই; যা পেয়েছি তাতেই আমি সন্তুষ্ট। যা পাইনি, সেটা না পাওয়াই থাক। সব পেয়ে গেলে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। জীবনটা এত সুন্দর হতো না। জীবনে অনেক পরিশ্রম থাকতে হবে। থাকতে হবে না পাওয়া। এসব না পাওয়া, দুঃখ-কষ্ট থেকে ভালো কিছু হবে। সেটাই হচ্ছে আমার জীবনে। সামনে ভালো ভালো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার ইচ্ছা রয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


