ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে পরিচালিত অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এমটিএফই (মেটাভার্স ফরেইন এক্সচেঞ্জ)-এর বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিদেশে পাচারকৃত অর্থের একটি অংশ উদ্ধার করেছে। যার পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৪৪ কোটি ১৪ লক্ষ ৬২ হাজার ৩০৩ টাকা।

সোমবার (৩০ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার এ তথ্য জানান।
‘এমটিএফই পঞ্জি স্কিম’-এর প্রতারণার শিকার হয়ে জনৈক ভুক্তভোগী খিলগাঁও (ডিএমপি) থানায় মামলা করেন। সেই সূত্র ধরেই তদন্ত শুরু করে সিআইডি। মামলার এজাহারে বাদী এমটিএফই নামক একটি বিনিয়োগ অ্যাপে প্রলুদ্ধ হয়ে প্রায় ২ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে সিআইডির তদন্তে অসংখ্য বিনিয়োগকারী কোটি কোটি টাকা প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।
মামলাটির তদন্তে আরও জানা যায়, এমটিএফই একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম। যা দ্রুততম সময়ে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতো। ২০২২ সালের জুন থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে এটি। তখন ঘরে বসে সহজে অর্থ উপার্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেসবুক ও ইউটিউবে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। ভিডিও ও বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহী হন। ২০২৩ সালের শুরুতে প্ল্যাটফর্মটির বিস্তার দ্রুত বেড়ে যায়। ব্যবহারকারীদের ভার্চুয়াল ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট দেওয়া হতো, যেখানে জমা অর্থ ডিজিটাল ডলার হিসেবে প্রদর্শিত হতো। তবে এটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া বা অস্তিত্বহীন। লাভ-ক্ষতির তথ্য কৃত্রিমভাবে তৈরি করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা হতো।
এমটিএফই স্কিম প্রাথমিকভাবে কিছু অর্থ পরিশোধ করে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন করে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এমটিএফই হঠাৎ সামগ্রিক কার্যক্রম বন্ধ করে উধাও হয়ে যায়। ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত ভার্চুয়াল মুদ্রা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ছিল। পক্ষান্তরে বিনিয়োগকারীদের অর্থ এমটিএফই-এর মূল ওয়ালেটে জমা হয়ে সেখান থেকে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটে ছড়িয়ে দেয়া হতো। এভাবে বাংলাদেশের থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয় মর্মে তদন্তে উঠে আসে।
প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া অর্থের একটি অংশ প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ইউএসডিটি (টেথার) আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ‘ওকেএক্স’-এ সংরক্ষিত রয়েছে বলে সিআইডির তদন্তে উঠে আসে। পরবর্তীতে ব্লকচেইন বিশ্লেষণ টুল ‘চেইনালিসিস রিয়্যাক্টর’ ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেই অর্থ এমটিএফই প্রতারণা চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ বিষয়ে ওকেএক্স এক্সচেঞ্জের লিগ্যাল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই অর্থ ফেরত দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তৎপরতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত পাচারকৃত সেই অর্থ ফেরত আনতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি, মালিবাগ শাখায় যৌথ ব্যাংক একাউন্ট খুলে সেই অর্থ গ্রহণ ও সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি-তে ‘সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশ’ নামে একটি সরকারি হিসাব খোলা হয়। একই সঙ্গে আদালতের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক পাচারকৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ মুদ্রায় রূপান্তর ও হস্তান্তরের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাসেট রিয়ালিটি লিমিটেডের সাথে সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশের লিখিত চুক্তি সম্পাদিত হয়।
অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেডের মাধ্যমে এভাবে প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করে সেই অর্থ সোনালী ব্যাংকের সরকারি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। সার্বিক প্রক্রিয়া শেষে সিআইডির হিসাব নম্বরে ৩৬ লক্ষ ২২ হাজার ৯৯৮ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লক্ষ ৬২ হাজার ৩০৩ টাকা জমা হয়। এ কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ-মার্কিন পারস্পরিক কূটনৈতিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মামলা রুজুর ৩ বছরেরও কম সময়ে বিদেশে পাচার হওয়া এ পরিমাণ অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) ইউনিট। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটন ও অন্যান্য আইনানুগ প্রক্রিয়ার স্বার্থে সিআইডির তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের মধ্যে অর্থ ফেরত প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এমটিএফই পনজি স্কিমের মাধ্যমে প্রতারণা করে পাচার করা বাকি অর্থ শনাক্ত ও উদ্ধার করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


