ইরান যুদ্ধের প্রভাবে উদ্ভূত জ্বালানি সংকটে ভর্তুকির বোঝা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে—এমন কারণ দেখিয়ে সরকার পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিদ্যুতের দাম

Advertisement

এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের পেশ করা একটি প্রস্তাব এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যেখানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ০৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

এমন এক মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যখন গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে এক হাজার ৯০০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে—যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দেশের বড় একটি অংশের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।

খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় অঘোষিত লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এবং হাসপাতাল ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

নোয়াখালীর ৯টি উপজেলার প্রায় সাড়ে ৯ লাখ গ্রাহক বর্তমানে চাহিদার তুলনায় নামমাত্র বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের মতে, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

চাটখিলের বাসিন্দা পলি আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ২৪ ঘণ্টায় আমরা বড়জোর ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। একবার বিদ্যুৎ আসার পর মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট থাকে, এরপরই আবার চলে যায়।

দীর্ঘ এই লোডশেডিংয়ের ফলে একদিকে যেমন পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ঘুম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে জেনারেটর চালাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোরও অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার খুলনায় এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ঘাটতি ৩০০ মেগাওয়াট।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতকাল প্রতি ঘণ্টায় এমনকি রাতেও লোডশেডিং হয়েছে, যার ফলে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঢাকার গ্রামীণ এলাকায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) গ্রাহকেরাও প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে পড়েছেন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; তার লক্ষ্য ছিল সিস্টেম লস কমিয়ে আর্থিক চাপ লাঘব করা।

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। পাশাপাশি এলএনজি, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলোর আমদানি খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কয়লা সরবরাহ বজায় রাখা এবং চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখার চেষ্টায় সরকারের ওপর আর্থিক বোঝার ভার দ্রুতই বেড়ে গেছে।

বর্তমান বিদ্যুতের দাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রকৃত উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম, যার ফলে সৃষ্ট বিশাল ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন খরচ ছিল ১২ টাকা ৩৬ পয়সা, যেখানে পাইকারি বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ৭ টাকা ০৪ পয়সা।

ফলে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও পিডিবিকে ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকায় আটকে রাখার পরিকল্পনা করা হলেও চলমান জ্বালানি সংকটে তা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রাথমিক জ্বালানির আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়। তবে মন্ত্রিসভা কিছু বিষয়ে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সেটি ফেরত পাঠায় এবং কর্মকর্তারা বর্তমানে তা নিয়ে কাজ করছেন।

পহেলা বৈশাখের আগে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয় বিদ্যুতের ট্যারিফ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার জন্য।

প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, পাইকারি দাম প্রতি ইউনিটে ৫০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা; এক টাকা বাড়ালে কমবে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, সেই গ্রাহকদের জন্য খুচরা দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত ও সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আইএমএফ অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রান্তিক গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ভর্তুকির বোঝা কমানোর ওপর চাপ দিয়ে আসছে।

প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলে, গণশুনানি শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পেশ করা হবে। প্রস্তাবে শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির উদাহরণও টানা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে, পিডিবির তথ্য অনুযায়ী গতকাল দিনের পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) ১৪ হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট; অর্থাৎ ঘাটতি ছিল এক হাজার ৯০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।

তবে সন্ধ্যায় চাহিদা বেড়ে ১৫ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও ঘাটতির পরিমাণ কমে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে। মোট ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের মধ্যে গ্যাস থেকে পাঁচ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে চার হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েল থেকে দুই হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। গতকাল ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬৬টি জ্বালানি সংকটের কথা জানিয়েছে।

আগের এক মূল্যায়নে দেখা গিয়েছিল যে, জ্বালানি সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৬০ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকবে; সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

পিডিবির গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনায় গ্যাস থেকে পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে পাঁচ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েল থেকে তিন হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

কয়লা সরবরাহের অভাবে চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার, কক্সবাজারের মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে; এই তিনটি বৃহৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা চার হাজার ৮০০ মেগাওয়াট।

সূত্র : ডেইলি স্টার

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.