রিজার্ভ হিসেবে বাংলাদেশের ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ১৪ টন স্বর্ণ মজুত রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ডলারের একক আধিপত্যে জিম্মি হয়ে পড়া ঠেকাতে ভূ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে স্বর্ণ মজুতের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বের ছোট-বড় বহু দেশ। এই বাস্তবতায় পর্যাপ্ত আমদানি ব্যয় নিশ্চিত করে ভবিষ্যতে স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

স্বর্ণ শুধু ব্যক্তিগত নিরাপদ বিনিয়োগই নয়, একটি দেশের মুদ্রার শক্তি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিও। কোনো দেশের স্বর্ণের মজুত যত শক্তিশালী, তার মুদ্রা ও অর্থনীতিও ততটা স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হয়।
মূলত ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর ডলারের বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তা কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের মুদ্রা শক্তিশালী করতে স্বর্ণের মজুত বাড়াতে শুরু করে। এ অবস্থায় স্বর্ণ মধ্যবিত্তের বিনিয়োগের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভূ-রাজনীতির একটি বড় উপাদানে পরিণত হয়।
তবে নতুন করে যদি কোনো বড় যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকট তৈরি হয় এবং ডলারে বিনিয়োগ বাড়ে, সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভবিষ্যতের ওপরই নির্ভর করছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সেন্ট্রাল ব্যাংক গোল্ড রিজার্ভ সার্ভেতে বলা হয়েছে, চলতি সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রায় ৯০০ টন স্বর্ণ কেনার পূর্বাভাস দিয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৪৩ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের মজুত আরও বাড়াতে আগ্রহী।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে বর্তমানে ১৪ টন স্বর্ণ রয়েছে, যার মধ্যে ১২ টন সংরক্ষিত আছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রিজার্ভের প্রায় ৬ শতাংশ। এছাড়া রিজার্ভে হিসাব হওয়া রুপার পরিমাণ ৫ হাজার ২৪৮ কেজি। ভবিষ্যতে স্বর্ণের মজুত বাড়ানো হবে কি না, তা নির্ভর করবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থার ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, যখন সেই সুযোগ তৈরি হবে, তখন রিজার্ভের বাস্কেট বাড়ানোর অংশ হিসেবে স্বর্ণেও বিনিয়োগ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণে বিনিয়োগ করা একটি সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এর আগে ২০২২ সালে যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলো-ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরিতে আগ্রহ দেখায়। ইউয়ানকে শক্তিশালী করতে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কেনা কমিয়ে স্বর্ণ মজুতে জোর দিয়েছে চীন।
পোল্যান্ড ও ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু অক্টোবর মাসেই ১৬ টন করে স্বর্ণ মজুত করেছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, চেক প্রজাতন্ত্র ও কিরগিজ প্রজাতন্ত্র ২ থেকে ৪ টন করে স্বর্ণ মজুত বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণকে ঘিরে এই ভূ-রাজনীতি ডলারের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে। বিষয়টি নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশেরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মার্কিন ডলার ব্যবস্থার পেছনে তেমন শক্ত অ্যাসেট নেই। অন্যদিকে ব্রিকস দেশগুলো তাদের মুদ্রাকে অ্যাসেট-ব্যাকড হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের এই সময়ে চীন ও ব্রিকস দেশগুলো ডলারনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে একটি বহুমুখী ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাইছে, যেখানে চীন তার মুদ্রাকে বিশ্বব্যাপী আরও জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে।
বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ মজুতকারী দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, ভারত, জাপান ও তুরস্ক। এছাড়া নিজেদের মুদ্রার মান ধরে রাখতে সার্বিয়া, মাদাগাস্কার ও দক্ষিণ কোরিয়া স্বর্ণের মজুত দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছে। এসব উদ্যোগ বিশ্ববাজারে ডলারের একক প্রভাবের বিপরীতে নতুন অংশীদারিত্ব তৈরি করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র : সময় নিউজ
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


