বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সোমবার জাপানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে এটি কেবল শেষ ষোলোর একটি ম্যাচ নয়; জাপানি ফুটবলের ইতিহাস, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই লড়াই।

দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলকে অনুসরণ করে নিজেদের ফুটবল গড়ে তুলেছে জাপান। তাই বিশ্বমঞ্চে সেই প্রেরণার উৎসকেই হারিয়ে নতুন ইতিহাস রচনার স্বপ্ন দেখছে এশিয়ার অন্যতম সফল দলটি।
প্রধান কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর নেতৃত্বে এবারের বিশ্বকাপে বড় লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নেমেছে জাপান। শুধু নকআউট পর্বে ওঠাই নয়, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের স্বপ্নও দেখছে তারা। গত কয়েক বছরে জার্মানি, স্পেন ও ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকে হারানোর অভিজ্ঞতা জাপানের আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই এবার তারা মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ব্রাজিলের।
জাপানের ফুটবলের বিকাশের ইতিহাসে ব্রাজিলের প্রভাব অনস্বীকার্য। ১৯৯৩ সালে দেশটির পেশাদার ফুটবল লিগ যাত্রা শুরু করার পর ব্রাজিলের কাঠামো ও দর্শন অনুসরণ করেই এগিয়েছে জাপানি ফুটবল। শুধু কৌশলগত নয়, মানবসম্পদ গঠনের ক্ষেত্রেও ব্রাজিল বড় ভূমিকা রেখেছে।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার জিকো জাপানে এসে খেলেছেন এবং দেশটির ফুটবল সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। পরবর্তীতে আরও অনেক ব্রাজিলিয়ান তারকা জাপানের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। এমনকি ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সাতজন সদস্যও জাপানের ক্লাব ফুটবলে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা, পেশাদারিত্ব ও ফুটবল দর্শন জাপানের উন্নয়নের পথকে আরও সুগম করে।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করা সেজার সাম্পাইও, যিনি পরবর্তীতে জাপানের একটি ক্লাবের জার্সিও গায়ে তুলেছিলেন, মনে করেন জাপানের বর্তমান অবস্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। তার মতে, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিক উন্নয়নের ফল আজকের জাপান। দাইজেন মায়েদা, আয়াসে উয়েদাদের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা দলটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটিই হবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ইতিহাসও জাপানকে সাহস জোগায়। ১৯৯৬ সালের অলিম্পিকে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল জাপান। সেই ম্যাচ আজও ‘মায়ামির অলৌকিক ঘটনা’ নামে স্মরণীয় হয়ে আছে। এছাড়া গত বছরের অক্টোবরের এক প্রীতি ম্যাচেও ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে পরাজিত করেছিল তারা।
তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুই দলের সাক্ষাৎ হয়েছে মাত্র একবার। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে সেই ম্যাচে ৪-১ গোলের ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ব্রাজিল। সেবার জাপানের কোচ ছিলেন জিকো, যিনি দেশটির আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্থপতি হিসেবে বিবেচিত।
ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া হলেও পরবর্তীতে জাপানের জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন রক্ষণভাগের সাবেক তারকা মার্কুস তুলিও তানাকা। তার মতে, এই ম্যাচের তাৎপর্য সাধারণ কোনো ফুটবল ম্যাচের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ দুই দেশের ফুটবল ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
তানাকা বলেন, একসময় তিনি কল্পনা করতেন এমন একটি দিনের, যখন বিশ্বকাপের মঞ্চে জাপান ও ব্রাজিল সমান শক্তি নিয়ে মুখোমুখি হবে। তার বিশ্বাস, সেই সময় এখন এসে গেছে। খেলোয়াড়দের মান, অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস—সবকিছু বিবেচনায় এবার দুই দলের ব্যবধান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কম।
তাই সোমবারের লড়াই শুধু নকআউট পর্বের একটি ম্যাচ নয়; এটি জাপানি ফুটবলের দীর্ঘ যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বহুদিনের শিক্ষককে হারিয়ে নিজেদের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগও বটে। আর সেই স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হতে পারে এই বিশ্বকাপই।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



