পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ-এর (পিইবি) একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের তামাক কর ব্যবস্থায় এখন কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

গবেষণা মতে, এখন শুধু করের হার বৃদ্ধি করে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা – কোনটিই আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না। বরং কর ব্যবস্থার ধরন পরিবর্তনই রাজস্ব বাড়াতে ও তামাকের ব্যবহার কমাতে সাহায্য করবে।
গবেষণায় দেশের বর্তমান চার স্তরের অ্যাড ভ্যালোরেম বা মূল্যভিত্তিক সিগারেট কর কাঠামোর সাথে, একটি নির্দিষ্ট শুল্ক ব্যবস্থা ও একটি মিশ্র কর মডেলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণের ফলাফল প্রমাণ করে যে, একমাত্র নির্দিষ্ট শুল্ক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সরকার আশানুরূপ ফল পেতে পারে।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনকালে পিইবি চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, একটি নির্দিষ্ট শুল্ক ব্যবস্থা গ্রহণ শুধুমাত্র রাজস্ব বৃদ্ধিই নয় বরং একই সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহারও কমাতে পারে। তার মতে, এই দুই লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়; বরং তামাক কর কাঠামোতে একটি নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থার মাধ্যমে দুটো লক্ষ্যই একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব।
গবেষণা অনুযায়ী, যদি বাংলাদেশে তামাকের কর কাঠামোতে একটি সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট শুল্ক ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয় তাহলে আগামী দশ বছরে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ২২,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতে পারে। পাশাপাশি সিগারেটের মোট ব্যবহার আরও প্রায় ৮.৬ শতাংশ কমতে পারে। এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বর্তমানে বাংলাদেশে সিগারেটের ওপর চার স্তরের মূল্যভিত্তিক কর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর সঙ্গে ভ্যাট ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ যোগ হয়ে মোট করের হার প্রায় ৮৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। অতীতে এই ব্যবস্থা রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রভাব কমে এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কর বৃদ্ধির পর রাজস্ব বেড়েছে মাত্র ৫ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরে সে পরিমাণ ছিল ১৭ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান কর কাঠামো অতিরিক্ত রাজস্ব বৃদ্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
মূল্যভিত্তিক কর ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো, দাম বাড়লে ভোক্তারা কমদামী স্তরের পণ্য ব্যবহারে আগ্রহী হয়। এতে তামাকের ব্যবহার প্রত্যাশিত মাত্রায় তো কমেই না, বরং সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব আয় করতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে সরকার মোট কর আয়ের প্রায় ৯ শতাংশ তামাক খাত থেকে পায়, ফলে এই খাতের কার্যকর কর ব্যবস্থাপনা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ মূল্যভিত্তিক কর হার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে মূল্য-ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে বাজারে মূল্য অস্থিরতা তৈরি হয়, যা বাজারে অবৈধ ও নকল সিগারেট বিক্রির সুযোগ তৈরি করে। এসব বিষয় রাজস্ব আদায়কে ক্ষতিগ্রস্থ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে জটিল করে তোলে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে নির্দিষ্ট শুল্ক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। এই ব্যবস্থায় প্রতি প্যাক সিগারেটের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণে শুল্ক আরোপ করা হয়। ফলে রাজস্ব আদায় আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য হয়, মূল্য অস্থিরতা কমে, বিভিন্ন স্তরের সিগারেটে মূল্য নির্ধারণে ভারসাম্য থাকে এবং কর প্রশাসন সহজ হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মিশ্র কর ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অংশের কর অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে, রাজস্ব স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য উন্নয়নেও ইরিবাচক ফলাফল মিলেছে।
আরও পড়ুনঃ
এই গবেষণা তামাক কর নিয়ে প্রচলিত একটি ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে যে, সরকারকে রাজস্ব ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যে যেকোন একটিকে বেছে নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে, সুপরিকল্পিত নির্দিষ্ট শুল্ক ব্যবস্থা রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা – উভয় লক্ষ্য পূরণেই সক্ষম। এটি যেমন সব স্তরের সিগারেটের সহজলভ্যতা কমায়, তেমনি কোন স্তরের দাম বাড়লে কমদামী সিগারেট সেবনের প্রবণতাও কমায়। ফলে তামাকের ব্যবহার কমার পাশাপাশি সরকারের রাজস্বেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে না।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


