সাইফুল ইসলাম : মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর, সুতালড়ী ও লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন ঘিরে পদ্মার চরাঞ্চল এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। জমি দখল, নদীর ঘাট ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, হামলা-হুমকি ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, যেকোন সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ কিংবা প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।

সম্প্রতি উপজেলা বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি হান্নান মৃধা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে এবং আজিমনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলী আকবর খান ও তার ভাই আকিব খানকে ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে হান্নান মৃধার বিরুদ্ধে জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা-হুমকি, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর চরাঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, চরের থমথমে পরিস্থিতির জন্য আলী আকবর খান ও তার লোকজনকে দায়ী করছেন হান্নান মৃধা ও তার অনুসারীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েকটি শক্তিশালী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চরাঞ্চলের মূল্যবান জমি ও আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী পক্ষগুলোর লোকজন প্রকাশ্যে মহড়া দিচ্ছে, ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং বিরোধীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, হান্নান মৃধার পক্ষে চরাঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে কাজ করছেন কৃষকদল নেতা মোহাম্মদ আলী, শামসুদ্দিন মেম্বার, জাহাঙ্গীর শিকদার, রাজা শিকদার, ইদ্রিস, কুদ্দুস, সাত্তার শিকদার ও সালাম শিকদারসহ আরও কয়েকজন। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আলী আকবর খানের গ্রুপে রয়েছেন মাসুম খান, বাবুল খান ও সজীব খানসহ আরও অনেকে।
এলাকাবাসীর দাবি, বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী হামলা ও হুমকির মুখে পড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গণমাধ্যমে কথা বললে পরে হামলা, মামলা কিংবা নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি জমির পাকা ফসল কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে হান্নান মৃধার অনুসারীরা বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আলী আকবর খানের গ্রুপ কিছুটা সংযত হলেও হান্নান মৃধার পক্ষ আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “চরের মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। কে কোন পক্ষের, সেটাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও চাপের মুখে পড়ছে।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, চলমান উত্তেজনার কারণে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। বিরোধপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
তবে হান্নান মৃধা ও তার অনুসারীরা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতেই পরিকল্পিতভাবে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তাদের মতে, প্রকৃতপক্ষে প্রতিপক্ষ গ্রুপই চরাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আওয়ামী লীগ নেতা আলী আকবর খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার ভাই আকিব উদ্দিন খান বলেন, “আমরা ব্যবসায়ী পরিবার। এলাকার মানুষের স্বার্থে নদীর গতিপথ ঠিক রাখতে গত বছর বালুমহাল ইজারা নেওয়া হয়েছিল। এবারও নিজস্ব অর্থায়নে ভাঙনরোধে সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। আমরা যা করেছি, এলাকার উন্নয়নের জন্যই করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “এ বছর বালুমহাল ইজারা নিয়েছেন আমার এক আত্মীয় বিল্লাল খান। তিনি ইজারা নিলেও এর সঙ্গে আমার পরিবারের কোনো সম্পৃক্ততা বা নিয়ন্ত্রণ নেই।”
অন্যদিকে বিএনপি নেতা হান্নান মৃধা দাবি করেন, চরাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের লোকজন পালিয়ে আছে। আলী আকবর খানের লোকজনই চর দখল করে রেখেছে। তারাই জমি দখলসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত।”
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “কেউ যদি লিখিত অভিযোগ করেন যে তার প্রাণনাশের হুমকি রয়েছে বা হামলার আশঙ্কা আছে, তাহলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। আর চরের জমি নিয়ে যে বিরোধ চলছে, সেটি মূলত ভূমি ব্যবস্থাপনা আইনের বিষয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় এসিল্যান্ড, ইউএনও বা জেলা প্রশাসন দায়িত্ব পালন করবে। তারা পুলিশের সহযোগিতা চাইলে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা করব।”
তিনি আরও বলেন, “ওই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। সেখানে সার্বক্ষণিক টহল দেওয়া কঠিন। তবে স্থানীয় থানা পুলিশের মাধ্যমে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বলা হয়েছে। চরে পুলিশের তদন্ত কেন্দ্র থাকলেও সেখানে মাত্র পাঁচজন সদস্য রয়েছে, যা এমন দুর্গম এলাকার জন্য খুবই অপ্রতুল।”
এদিকে সচেতন মহলের অভিযোগ, পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ তেমন দেখা যাচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আগে হয়তো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
স্থানীয় এক সমাজসেবক বলেন, “চরাঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোন সময় বড় ধরনের হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। এতে নিরীহ মানুষের প্রাণহানিও হতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, হরিরামপুরের চরাঞ্চলের বর্তমান সংকট শুধু রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমির নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিরোধের কার্যকর সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি এখন বিস্ফোরণমুখী হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, টহল জোরদার এবং কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। অন্যথায় চরাঞ্চলের এই নীরব উত্তেজনা যেকোন সময় ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে এবং ঘটতে পারে প্রাণহানির ঘটনাও।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



