সাইফুল ইসলাম : মানিকগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক কারাবন্দীর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওমর ফারুক (৪০) জেলার ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের বৈন্যাপ্রসাদ গ্রামের সাইজউদ্দিন মিয়ার ছেলে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস আগে মাদক ও একটি বিদেশি পিস্তলসহ যৌথবাহিনীর অভিযানে নিজ গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার হন ওমর ফারুক। এ ঘটনায় মাদক ও অস্ত্র আইনে ঘিওর থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। আদালতের নির্দেশে এরপর থেকে তিনি জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, কারাবন্দী থাকা অবস্থাতেও কারাগারের ভেতর থেকেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি।
একাধিক সূত্রের দাবি, অস্ত্র কেনাবেচার একটি ডিল চূড়ান্ত করতে অসুস্থতার অজুহাত তৈরি করে তিনি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সেখানে অবস্থানকালে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করেন। এ ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের একাংশের সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের কথা জানিয়ে কারা হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শ নেন ওমর ফারুক। নিজেকে অসুস্থ দাবি করে কারা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় পরদিন ১৭ ফেব্রুয়ারি তাকে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। আউটডোর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দুপুর ১২টার দিকে তাকে সিসিইউ ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি অপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিকেও তার সঙ্গে দেখা করতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে অস্ত্র, অর্থ ও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। অনুসন্ধান চলাকালে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। আশপাশের বেডে চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগী জানান, একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন ওমর ফারুক।
বিষয়টি নিয়ে অন্যান্য রোগীদের কৌতূহল ও নজরদারি টের পেয়ে দ্রুত কেবিনে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেন তিনি। পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর সোয়া তিনটার দিকে তাকে অষ্টম তলার ৮০৭ নম্বর কেবিনে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে সরেজমিনে ৮০৭ নম্বর কেবিনে গিয়ে দেখা যায়, ওমর ফারুকের চিকিৎসার ফাইলে তার পালস রেইট কিছুটা বেশি হলেও রক্তচাপ এজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের মতো স্বাভাবিক রয়েছে।
এছাড়া, নার্সদের ডিউটি টেবিলের সামনে একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। কেবিনের ভেতরে মেঝেতে পাতা বিছানায় আরেকজন পুলিশ সদস্য ঘুমিয়ে আছেন। এছাড়া দুইজন কারারক্ষী একটি লোহার বেঞ্চে বসে ছিলেন। হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় বেডে শুয়ে ছিলেন ওমর ফারুক।
তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্বাসকষ্ট ও হৃদ্যন্ত্রজনিত সমস্যা ছিল, তবে বর্তমানে কিছুটা সুস্থ আছেন। চিকিৎসক কী ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, ইসিজি করা হয়েছে। রিপোর্ট দেখতে চাইলে তা সঙ্গে নেই বলে জানান। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি হঠাৎ উঠে বসার চেষ্টা করেন, যা দেখে তাকে গুরুতর অসুস্থ মনে হয়নি। অস্ত্র ও মাদক সংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে সেনাবাহিনীর হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে বর্তমানে শুধুমাত্র চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে জেলা কারাগারের সহকারী সার্জন ডা. আজয় কুমার বলেন, “বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের অভিযোগ নিয়ে ফারুক নামের এক কারাবন্দীকে আমি দেখেছি। পরবর্তীতে তাকে সরকারি হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখেছেন।” কারাগারে চিকিৎসা দেওয়ার একদিন পর সরকারি হাসপাতালে পাঠানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি জেল সুপারের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর খান মুঠোফোনে জানান, “আমি সরকারি কাজে টাঙ্গাইলে গ্রামের বাড়িতে আছি। আমার সামনে এখন অনেক লোকজন আছে। পরে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানাব।”
মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আরিফুল ইসলাম আরিফ বলেন, “কারাগার থেকে আসা রোগীকে প্রথমে সিসিইউতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অবস্থা গুরুতর না হওয়ায় তাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাকে ডিসচার্জ দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনায় রয়েছে।”
ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


