নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)-এর সাম্প্রতিক কর্মকর্তা নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অস্বাভাবিক দ্রুততায় নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে, যা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ইউজিসির অভ্যন্তরীণ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির ইতিহাসে এ ধরনের দ্রুতগতির নিয়োগ প্রক্রিয়া আগে দেখা যায়নি। তাদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি সন্দেহজনক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হচ্ছে। তবে ইউজিসির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অনিয়মের কথা স্বীকার করা হয়নি।
নিয়োগ প্রক্রিয়াটি শুরু হয় গত ১১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে। ওই দিন ইউজিসি/প্রশাঃ/১২১(১২)/২০১৮/২৩১৭ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে ৯ম গ্রেডের ২২ জন কর্মকর্তাসহ মোট ৩৮টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নির্ধারিত বেতন স্কেল ছিল ২২,০০০ থেকে ৫৩,০৬০ টাকা। বিজ্ঞপ্তিটি ইউজিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ১২ আগস্ট দৈনিক আমার দেশ ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী সচিব, সহকারী পরিচালক, একাউন্টস অফিসার, বাজেট অফিসার ও অডিট অফিসার পদের জন্য এসএসসি ও এইচএসসিতে ন্যূনতম জিপিএ ৩.৫০ এবং স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.২৫ নির্ধারণ করা হয়। টেকনিক্যাল পদগুলোর ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৪.০০ এবং স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.২৫ যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। এসব যোগ্যতা মানদণ্ডকে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক দাবি করে একাধিক চাকরিপ্রার্থী সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (GRS)-এ অভিযোগ দাখিল করেন।
চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে যোগ্যতা সংশোধন করে। সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৩.২৫ এবং স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.০০ নির্ধারণ করা হয়, যা ৫ সেপ্টেম্বর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সংশোধনের ফলে প্রার্থীদের একটি অংশ স্বস্তি পেলেও, এর পরপরই নিয়োগ প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির পর টেকনিক্যাল পদগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করা হয়। ৫ ও ৬ ডিসেম্বর এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়া হয়, পরীক্ষার দিনেই ফল প্রকাশ করা হয় এবং ৭ ডিসেম্বর মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত নির্বাচন সম্পন্ন হয়। পরদিন বিশেষ কমিশন সভায় এসব নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। ইউজিসির ওয়েবসাইটে ফল প্রকাশিত হলেও এত দ্রুততার পেছনের কারণ সম্পর্কে কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সহকারী সচিব ও সহকারী পরিচালক পদে সাত হাজারের বেশি প্রার্থীর অংশগ্রহণের কথা থাকলেও ১৯ ডিসেম্বর নির্ধারিত এমসিকিউ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয় ১৬ জানুয়ারি ২০২৬। একই সময়ে কিছু পদের নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ায় কমিশনের ভেতরেই দ্বৈত মানদণ্ড অনুসরণের অভিযোগ ওঠে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন ইউজিসি সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট আরেক সদস্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকার কারণে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিয়োগে সুবিধা পেয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে গত ২৯ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে ইউজিসির নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অস্বাভাবিক দ্রুত, বৈষম্যমূলক ও স্বচ্ছতাবিহীন উল্লেখ করে সম্ভাব্য দুর্নীতির বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় বিষয়টি তদন্তযোগ্য বলেও উল্লেখ করা হয়।
ইউজিসির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক নিয়োগের ফলে ভবিষ্যতে তাদের পদোন্নতির সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে যখন বহু পদোন্নতি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী নতুন কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক উচ্চশিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। এখন দুদকের সম্ভাব্য পদক্ষেপ এবং ইউজিসির আনুষ্ঠানিক অবস্থানের দিকেই সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।

