এ আবিষ্কারকে ‘জলচর ধারণার চূড়ান্ত অবসান’ বলে বর্ণনা করেছেন গবেষক সেরেনো। যার থেকে ইঙ্গিত মেলে, পুরোপুরি গভীর পানির বাসিন্দা ছিল না এরা।

সাহারা মরুভূমির এক প্রত্যন্ত ও জনমানবহীন জায়গায় নাইজারে নতুন এক প্রজাতির ডাইনোসর জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা ছিল মাংসাশী ডাইনোসরদের মধ্যে অন্যতম বড় আকারের প্রাণী।
এর নাম স্পিনোসরাস।
এ বিশালাকায় প্রাণীটি বনাঞ্চলে ঘেরা এলাকায় ঘুরে বেড়াত এবং মাছ ধরার জন্য বর্তমান যুগের বক বা পানকৌড়ির মতো নদীর পানিতে হেঁটে বেড়াত, যাকে ‘হেল হেরন’ বা ‘নরকের বক’ বলে বর্ণনা করেছেন একজন গবেষক। ডাইনোরসরটি লম্বায় প্রায় ৪০ ফুট ও এর ওজন ৫ থেকে ৭ টনের মতো।
রয়টার্স লিখেছে, সাড়ে ৯ কোটি বছর আগে আফ্রিকার মহাদেশীয় পরিবেশে এ ডাইনোসরটি এক নজরকাড়া দৃশ্য তৈরি করত। ওই সময় এ অঞ্চলের বিভিন্ন জলাশয়ে ‘সিলিক্যান্থ’-এর মতো বড় বড় মাছ শিকার করত এ ডাইনোসর প্রজাতিটি। এর মাথার ওপর প্রায় ২০ ইঞ্চি উঁচু হাড়ের তৈরি ঝুঁটিটি দেখতে ছিল বাঁকানো তলোয়ারের মতো। এর ছিল কুমিরের মতো দীর্ঘ চোয়াল, পিঠে পালের মতো বড় গঠন।
এ প্রাণীর গণ বা জেনাস-এর নাম ‘স্পিনোসরাস’, যার অর্থ ‘কাঁটাওয়ালা টিকটিকি’। এর সঙ্গে মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা এ প্রজাতির নাম দিয়েছেন ‘মিরাবিলিস’। লাতিন এ শব্দের মানে ‘বিস্ময়কর’, যা এর মাথার অদ্ভুত ঝুঁটিটিকে নির্দেশ করে।
সহজভাবে বললে, গণ হচ্ছে কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যওয়ালা প্রাণীদের একটি দল। যেমন সিংহ ও বাঘ একই গণের অন্তর্ভুক্ত হলেও এদের প্রজাতি আলাদা।
‘স্পিনোসরাস’ গণের আবিষ্কৃত দ্বিতীয় প্রজাতি নতুন এ ডাইনোরসরটি। ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমাতে দেখানোর কারণে এ ডাইনোসরটি পপ কালচারে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ গণের অন্য প্রজাতিটি হচ্ছে ‘স্পিনোসরাস এজিপটিয়াকাস’, যার নামকরণ হয়েছিল ১৯১৫ সালে মিশরে পাওয়া জীবাশ্মের ওপর ভিত্তি করে।
এখন পর্যন্ত জানা একমাত্র ডাইনোসর শিকারি স্পিনোসরাস, যারা ডাঙার পাশাপাশি পানিতেও থাকতে পারত, অর্থাৎ আধা-জলচর। টাইরানোসরাস, গিগানোটোসরাস ও কারচারোডন্টোসরাস-এর মতো বিশ্বের বিশালতম মাংসাশী ডাইনোসরদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে স্পিনোসরাস।
এ দুটি স্পিনোসরাস প্রজাতি একই সময়ের ছিল। এদের দেহের গঠনও ছিল প্রায় একই রকম, যেমন পিঠের ওপর পালের মতো খাড়া কাঁটা ও মাছ শিকারের উপযোগী বিশেষ ধরনের মাথার খুলি।
তবে ‘স্পিনোসরাস এজিপটিয়াকাস’-এর তুলনায় নতুন আবিষ্কৃত ‘স্পিনোসরাস মিরাবিলিস’-এর মাথার ঝুঁটি ছিল অনেক বড়। এর চোয়াল বেশি লম্বা, দাঁতগুলো একটি থেকে অন্যটি বেশ ছড়ানো ও পেছনের পা দুটি তুলনামূলক দীর্ঘ।
গবেষকরা বলছেন, এ ঝুঁটিটি সম্ভবত প্রদর্শনী বা সৌন্দর্যের জন্য ব্যবহৃত হত, যা নিরেট হাড় দিয়ে তৈরি হলেও অন্যান্য ডাইনোসরের মতো ভেতরে বাতাস চলাচলের ছিদ্র ছিল না।
ঝুঁটিটি অস্ত্রের মতো ব্যবহার করার মতো যথেষ্ট শক্তও নয়। ষাঁড়ের শিংয়ের মতো ‘কেরাটিন’ দিয়ে ঢাকা থাকত ঝুঁটিটি। এটি হয়ত খুব উজ্জ্বল রঙের ছিল, যা এদের নিজেদের এলাকা রক্ষা করতে বা সঙ্গী আকর্ষণের লড়াইয়ে একে অপরকে চিনতে সাহায্য করত।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ‘ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো’র জীবাশ্মবিদ পল সেরেনো। তিনি বলেছেন, “ঝুঁটিটি কেবল দেখানোর জন্য ছিল না, বরং এদের ভালোবাসা বা সঙ্গী খোঁজা ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে যেমন প্রিয় এলাকাটি দখলেও বড় ভূমিকা রাখত। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কী হতে পারে?”
ডাইনোসরটির নাকের ছিদ্রগুলো অপেক্ষাকৃত পেছনের দিকে ছিল। ফলে দীর্ঘ চোয়ালের বেশিরভাগ অংশ পানির নিচে ডুবিয়ে শিকারের জন্য ওত পেতে থাকতে ও একইসঙ্গে স্বাভাবিকভাবে শ্বাসও নিতে পারত এরা।
এ ছাড়া, এর উপরের ও নিচের পাটির বিভিন্ন দাঁত কামড় দেওয়ার সময় একে অপরের খাঁজে একেবারে নিখুঁতভাবে আটকে যেত, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ইন্টারডিজিটেশন’।
এ গবেষণার সহ-লেখক এভং ‘ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো’ ও স্পেনের ‘ইউএনইডি’-এর জীবাশ্মবিদ দানিয়েল ভিদাল বলেছেন, “এদের বড় ও শঙ্কু আকৃতির দাঁতগুলোতে কোনো করাতের মতো খাঁজ ছিল না। এসব দাঁত কামড় দেওয়ার সময় একটির সঙ্গে অন্যটি আঙুলের মতো গেঁথে গিয়ে মাছ ধরার ফাঁদ তৈরি করত, যা পিচ্ছিল মাছের শরীরে বিঁধে গিয়ে সেগুলোকে চোয়ালের ভেতরে আটকে রাখতে ও পিছলে যাওয়া ঠেকাতে কার্যকর ছিল।
“স্পিনোসরাস মিরাবিলিস-এর মধ্যে মাছ শিকারের জন্য এমন কিছু চরম পর্যায়ের শারীরিক বিবর্তন দেখা যায় যা অন্য কোনো ডাইনোসরে নেই। ফলে আমরা নিশ্চিত, অন্য ডাইনোসর স্থলচর শিকার ধরার চেয়ে মাছ শিকারেই বেশি পটু ছিল এরা।”
‘স্পিনোসরাস এজিপটিয়াকাস’-এর জীবাশ্ম মিশর ও মরক্কোর এমন কিছু এলাকায় মিলেছিল, যা ওই সময় টেথিস সাগরে উপকূলের কাছাকাছি ছিল। এ টেথিস সাগরই বর্তমান ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগরের পূর্বসূরি।
উপকূলে পাওয়া যাওয়ায় ও কঙ্কালের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক বিজ্ঞানী ধারণা করেছিলেন, স্পিনোসরাস হয়ত পুরোপুরি জলচর এবং গভীর সমুদ্রের খোলা পানিতে সাঁতার কেটে বা ডুব দিয়ে শিকার করত।
তবে ‘স্পিনোসরাস মিরাবিলিস’-এর বিভিন্ন জীবাশ্ম পাওয়া গেছে মূল ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে, যা ওই সময় সমুদ্র উপকূল থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ১ হাজার কিলোমিটার দূরে ছিল।
গবেষকরা বলেছেন, এ ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাণীটির শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, স্পিনোসরাস আসলে অগভীর পানির শিকারি ছিল, এরা পুরোপুরি জলচর বা গভীর সমুদ্রের বাসিন্দা ছিল না।
এ আবিষ্কারকে ‘জলচর ধারণার চূড়ান্ত অবসান’ বলে বর্ণনা করেছেন গবেষক সেরেনো। যার থেকে ইঙ্গিত মেলে, পুরোপুরি গভীর পানির বাসিন্দা ছিল না এরা।
যেখানে এসব জীবাশ্ম মিলেছে সেসব ‘জেঙ্গুয়েবি’ হচ্ছে সাহারা মরুভূমির এক দুর্গম এলাকা। সেখানে বালিয়াড়ির মধ্যে জীবাশ্মওয়ালা বেলেপাথরের পাহাড় জেগে আছে।
২০২২ সালে এ অভিযানের জন্য আগাদেজ শহর থেকে এক গাড়িবহর নিয়ে রওনা হয়েছিলেন গবেষকরা। মরুভূমির বালুকা রাশি দিয়ে প্রায় তিন দিন ধরে রাস্তা ছাড়া গাড়ি চালিয়ে তারা সেখানে পৌঁছান, পথে বারবার তাদের গাড়ি বালুতে আটকে যাচ্ছিল।
তবে তাদের এ কঠিন যাত্রা সফল হয়েছে। সেখানে তিনটি ‘স্পিনোসরাস মিরাবিলিস’-এর মাথার খুলির অংশ ও অন্যান্য হাড় খুঁজে পেয়েছেন তারা। সেইসঙ্গে আরও কিছু প্রাচীন প্রাণীর জীবাশ্মও মিলেছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের কল্পনাজুড়ে টি-রেক্স-এর যে বিশাল প্রভাব ছিল তারই আড়ালে ঢাকা পড়েছিল স্পিনোসরাস। তবে এখন স্পিনোসরাস তার প্রাপ্য মর্যাদা ও পরিচিতি পাচ্ছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


