ইরানের শাসনব্যবস্থা যখন পাঁচ দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে, ঠিক তখনই দেশটির হাল ধরলেন এমন একজন নেতা যিনি এর আগে কখনোই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। এই যুদ্ধের একদম শুরুতেই তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও পারিবারিক প্রভাবই তার ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর মোজতবা হলেন ইরানের তৃতীয় সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা। তবে এমন এক সময়ে তিনি দায়িত্ব নিলেন যখন ইরান নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
৮৮ জন মুসলিম শিয়া কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ মোজতবাকে বাছাই করার পরপরই বিপ্লবের কট্টর সমর্থকরা ইরানের রাজপথে নেমে আসেন। ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন তারা।
ইরানের সবগুলো নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নতুন কমান্ডার ইন চিফের প্রতি ‘শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত’ অনুগত থাকার শপথ নিয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখা গেছে, মোজতবার নামে ছোঁড়া প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গায়ে লেখা ছিল, ‘আপনার সেবায় নিয়োজিত, সৈয়দ মোজতবা’। তবে, বিরোধিতাও রয়েছে, জানুয়ারিতে তার বাবাকে ‘স্বৈরশাসক’ আখ্যা দিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন যারা তারা গতরাতেও ‘মোজতবার মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দিয়েছেন।
এই আন্দোলনে প্রাণ হারানো হাজার হাজার মানুষের জন্য যারা এখনেও শোক পালন করছেন তারা মনে করছেন ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন আরও কঠোর, কট্টরপন্থি হবে। তারা এখনও আশা করতে সাহস করছেন যে, খামেনির দিন এবং তার শাসন ব্যবস্থার দিন হয়তো ফুরিয়ে আসছে।
নিহত আলী খামেনির দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী সন্তান মোজতবা খামেনি তার বাবার অতি রক্ষণশীল আদর্শে গড়া। গত কয়েক দশক ধরে মোজতবা তার বাবার ছায়ায় থেকে কাজ করেছেন। দেশের বাইরের হুমকি এবং দেশের ভেতরে গণঅভ্যুত্থান হলে ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানেন মোজতবা। ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে, কেননা কিশোর বয়সেই এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
মোজতবা হাইস্কুলের পাঠ শেষ করে কোমে পড়াশোনা করতে যান, যে শহরটি শিয়া ইসলামিক অধ্যয়নের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব রক্ষার জন্য গঠিত এই বাহিনী এখন কেবল সামরিক শক্তি নয় বরং দেশটির বিশাল এক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যও নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশটির সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এখন এই বাহিনীর কমান্ডাররাই। মোজতবা ছিলেন তাদের নিজস্ব প্রার্থী। এই যুদ্ধ এখন আর শুধু রাজনৈতিক যুদ্ধ নয়, বরং এখন ব্যক্তিগত প্রতিশোধের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি হামলায় মোজতবা খামেনি শুধু তার বাবাকেই হারাননি, বরং তার মা মানসুরে খোজাস্তে বাঘেরজাদে এবং স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং নিজের এক সন্তানকেও হারিয়েছেন। তিনি নিজেও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে, কিন্তু বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওই ঘটনার পর থেকে এমনকি তার কোনো চিহ্নও প্রকাশ্যে আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, তিনি তার আদেশ অমান্যকারীদের মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছেন না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকারী নিয়ে জল্পনা শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার বলেছিলেন, আলী খামেনির এই কট্টরপন্থি ছেলেকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য’। তিনি এখনও সতর্ক করছেন যে, মোজতবা খামেনি ‘বেশিদিন টিকবে না’। ইসরায়েলের নজরেও রয়েছেন তিনি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ তাকে একজন ‘সুস্পষ্ট লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
তাই খামেনি হয়তো আরও কিছুদিন আড়ালেই থাকবেন। এই অন্তরাল তাকে ঘিরে রহস্য আরও গভীর করবে। তিনি খুব কমই জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছেন, তার প্রকাশ্যে কোনও বক্তৃতার রেকর্ড নেই এবং তিনি কখনও কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি চাকরিও করেননি। বাবার প্রতিকৃতির পাশে কখনো তার ছবিও দেখা যায়নি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


