রাজধানীর শাহবাগ মানেই ব্যস্ততা। কিন্তু শুক্রবারের ছুটির সকালে দৃশ্যপটটা একটু ভিন্ন। ঘড়ির কাঁটায় প্রায় এগারোটা, শাহবাগ জাদুঘরের সামনে বটতলায় দাঁড়িয়ে মনে হলো, ভুল করে গ্রামের কোনো চালের হাটে চলে আসলাম না তো! হাটে যেমন সারি সারি দোকান থাকে, এটি অবশ্য তেমন নয়; তারপরেও হাট।

দেশি জাতের চাল

Advertisement

বটগাছের নিচে—কাগজের নানা রঙের বক্সে সাজানো হরেক রকমের দেশি চাল। যারা ভাবেন চাল মানেই কেবল নাজিরশাইল আর মিনিকেট, তাদের জন্য এই হাট এক পরম বিস্ময়ের। রাতাবোরো, তুলশিমালা, চামারা, টোপাবোরো, বাঁশফুল, চিনিগুঁড়া, বিরই—নানা নামের চাল। কেবল চালই নয়, আছে ভাঙা খাঁটি সরিষার তেল, মধু, ডাল এবং মাটির চুলায় ভাজা দেশি মুড়িও।

এই হাটের উদ্যোক্তা হলেন মো. নাফিজুর রহমান। এই ধরনের কাজের পরিকল্পনা কীভাবে এলো জানতে চাইলে তিনি বলেন “দেশি চালের হাট ছোট্ট পরিসরে শুরু করা হয় চার থেকে পাঁচ বছর আগে। আসলে আমাদের দেশে ক্যান্সার, কিডনি—এ ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি বাড়ছে। এর রহস্যটা কী? আমরা আমাদের আদিবীজ বা দেশালবীজ খাওয়া থেকে সরে এসে কর্পোরেট কোম্পানি ও বিদেশি হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকেছি। চাষ করছি বেশি ফলনের আশায়। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই ভাবনা থেকেই বুঝলাম, কাউকে না কাউকে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি আমার পরিবারকে আগে নিরাপদ রাখতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই কর্পোরেট জীবনযাপন ছেড়ে এই কাজ শুরু করি।”

প্রতি শুক্রবারে বসে এই চালের হাট। বেলা এগারোটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। এই হাটে যে চালগুলো বিক্রি করা হয়, সেগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক ধরনের বিস্ময় হতে পারে। এর প্রধান কারণ, এসব জাতের ধান এখন খুব কমসংখ্যক কৃষক উৎপাদন করেন। এ ধরনের ফসল সাধারণত পদ্মার পাড়, হাওর এলাকাতে বেশি উৎপাদিত হয়। অধিক পানির মধ্যেও এসব ধান ফলানো সম্ভব। যেহেতু হাওর অঞ্চলের জমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে, তাই এসব ফসল সেখানে সহজে উৎপন্ন হয়। আসুন, পরিচিত হই চালগুলোর নাম ও ব্যবহার সম্পর্কে—

১. তুলশিমালা চাল
এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সুগন্ধি চাল। দানায় ছোট এবং সুগন্ধে অতুলনীয়।
বৈশিষ্ট্য: রান্নার পর খুব ঝরঝরে থাকে এবং চমৎকার ঘ্রাণ ছড়ায়। একে সুগন্ধি চালের ‘রাজপুত্র’ বলা হয়।
কী বানানো যায়: পোলাও, বিরিয়ানি, ফিরনি, পায়েস এবং জর্দা।

২. চিনিগুঁড়া চাল
বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত সুগন্ধি চাল। দানা ছোট, অনেকটা চিনির মতো দেখতে।
বৈশিষ্ট্য: রান্নার পর দানাগুলো সুন্দর দেখায় এবং খানিকটা মিষ্টি স্বাদের।
কী বানানো যায়: সাদা পোলাও, ভুনা খিচুড়ি, পিঠা ও ক্ষীর।

৩. কালোজিরা চাল
এটিও এক ধরনের সুগন্ধি চাল, আকারে ছোট।
বৈশিষ্ট্য: পুষ্টিগুণ বেশি এবং হজমে সহায়ক।
কী বানানো যায়: সাদা ভাত, ফিরনি, চালের রুটি।

৪. ঢেঁকিছাটা চাল
এটি কোনো নির্দিষ্ট জাত নয়, বরং চাল প্রস্তুতের একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি।
বৈশিষ্ট্য: লালচে রঙের এই চালে কুঁড়া অক্ষুণ্ণ থাকে, যা ফাইবার ও ভিটামিন বি-সমৃদ্ধ।
কী বানানো যায়: লাল চালের ভাত, দুধ-কলা দিয়ে খাওয়ার জন্য উপযুক্ত।

৫. বিরই চাল
উত্তরবঙ্গ ও সিলেট অঞ্চলে জনপ্রিয় লালচে চাল।
বৈশিষ্ট্য: একটু আঠালো এবং মাটির সোঁদা গন্ধ রয়েছে।
কী বানানো যায়: ভাত, শুঁটকি ভর্তা, ঘন ডাল, চুঙা পিঠা।

৬. রাঁধুনীপাগল চাল
নামের মধ্যেই এর বিশেষত্ব।
বৈশিষ্ট্য: অতিশয় সুগন্ধি ও চিকন দানার চাল।
কী বানানো যায়: পোলাও ও ফিরনি।

৭. চিনি আতপ ও বাঁশফুল চাল
বাঁশফুল চাল লম্বা ও চিকন, চিনি আতপ ঝকঝকে।
বৈশিষ্ট্য: দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং ঝরঝরে থাকে।
কী বানানো যায়: চিতই পিঠা, তেলের পিঠা, নিরামিষ রান্না।

৮. রাতাবোরো ও কালীবোরো
বোরো মৌসুমের পুষ্টিকর চাল।
বৈশিষ্ট্য: কালীবোরো চালের বাইরের আবরণ কালচে, ভেতর সাদা।
কী বানানো যায়: প্রতিদিনের ভাত, আলু ভর্তার সঙ্গে খাওয়ার জন্য উপযুক্ত।

৯. চামারা ও টোপাবোরো।
নিচু জমিতে উৎপন্ন দেশি চাল।
বৈশিষ্ট্য: দানা মোটা এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
কী বানানো যায়: ভুনা খিচুড়ি, পান্তা ভাত।
এই চাল রান্নার আগে খুব বেশি ধোবেন না। কারণ দেশি অর্গানিক চালের উপরের পুষ্টিগুণ ধোয়ার ফলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। হালকা হাতে ধুয়ে রান্না করলেই এর আসল স্বাদ ও সুগন্ধ পাওয়া যাবে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

শাহবাগের এই দেশি জাতের চালের হাট আমাদের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আগামী শুক্রবারের ছুটির সকালে একবার ঘুরে আসতেই পারেন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.