মোঃ সোহাগ হাওলাদার : ঢাকার ধামরাই উপজেলার রোয়াইল ইউনিয়নে আধিপত্যের অন্য নাম সামছুল হক, যিনি এলাকায় ‘পীর সাহেব’ হিসেবে পরিচিত। তার দাপটে এলাকাবাসীর জীবন যেন এক খোলা কারাগার। ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতার আড়ালে তিনি এবং তার ভাই শহীদুল্লাহ কাউসার গড়ে তুলেছেন এক ভয়ঙ্কর অপরাধ চক্র। জোর করে জমি দখল, রাতের আঁধারে মাটি কাটা, এবং অবৈধভাবে নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন—এসব যেন তাদের নিত্যদিনের কাজ। আর এসব নিয়ে কেউ মুখ খুললেই নেমে আসে ভয়ঙ্কর নির্যাতন। ভয়ে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন, আর যারা আছেন, তারা মুখ বুজে সহ্য করে কোনোমতে বেঁচে আছেন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা যায়, সামছুল হক একসময় আওয়ামী লীগের শরীক দল বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তার ছোট ভাই শহীদুল্লাহ কাউসার, যিনি ঢাকা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলমের শ্বশুর, এই রাজনৈতিক পরিচয়ের ঢাল ব্যবহার করে এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসছেন। ক্ষমতার এই মিশ্রণ তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।
স্থানীয়রা জানান, সামছুল হকের ক্ষমতার অপব্যবহার এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তার বিরুদ্ধে কথা বলা তো দূরের কথা, এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে কোনো ধরনের আলোচনাও যেন নিষিদ্ধ। তার দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামবাসী যখন প্রতিবাদ করতে সাহস পান না, তখন অপরাধ চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সম্প্রতি, সামছুল হকের নির্দেশে একটি জামিয়া অ্যারাবিয়া চরসাঙ্গুর আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নামের একটি মাদ্রাসা জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তবে কোন প্রতিবাদ করার সাহস টুকু দেখায়নি।
স্থানীয়দের তথ্য ও অনুসন্ধানে ভিত্তিতে আরও জানা যায় , সামছুল হক এবং তার চক্রের হাতে জমি ও সম্পদ হারিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। জোরপূর্বক জমি দখল এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে মাটি কাটার কারণে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। মোহনা টেলিভিশনের মালিক সাবেক মন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারে ধামরাই অবস্থিত ৪৫টি পুকুর দখলে নিয়েছেন পীর সাহেব। সেই সাথে ধামরাই বংশী নদীর বিভিন্ন শাখায় তার নামে চলছে ৭টি অবৈধ ড্রেজার। বর্তমানে চালু রয়েছে ২টি। তার নেতৃত্বে হয়েছে সরকারী লিজকৃত জমি দখল ও মাটি বিক্রির অভিযোগ ও। তবে প্রশাসন যেন তাদের নাগালের বাহিরে। এদিকে এক ভুক্তভোগীর এক একর ফসলি জমি দখল করে মাটি কেটে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহে গেলে প্রকাশ্যে তথ্য দাতাদের হুমকি দেন পীর সাহেবের লোকজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী জানান, “শামসুল হক এবং তার লোকজন রাতের আঁধারে জোর করে আমাদের ফসলি জমির মাটি কেটে নিয়ে যায়। প্রতিবাদ করলে তারা প্রাণনাশের হুমকি দেয়। পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না। কারণ তাদের ক্ষমতা অনেক বেশি।”
শুধু তাই নয়, নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলনের কারণে নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছে, যা বর্ষাকালে বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এই অপরাধ চক্রের কারণে একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেই প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থী (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম ব্যবহার করা হয়নি) জানান, “কাউসার সাহেব ও পীর সাহেবের লোকজন এসে হঠাৎ করে এসে মাদ্রাসা বন্ধের ঘোষনা দেয়। সাথে মসজিদে নামাজ পড়ানোর জন্য দুই জন শিক্ষার্থীকে রেখে বাকী দুশতাধিক শিক্ষার্থীকে অনির্দিষ্টকালের ছুটি দিয়ে দেয়। হুজুরদের বেল করে দেয়। এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। সেই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ” ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত। পড়ালেখা করতে পারছি না। এই সময়ে কোথায় গিয়ে ভর্তি হবো। একটা বছর গ্যাপ গেলে আমাদের সব দিক দিয়ে সমস্যা”
একজন স্থানীয় বৃদ্ধ আক্ষেপ করে বলেন, “পীর সাহেব হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিল, কিন্তু তার ভেতরের রূপটা একেবারে হিংস্র। আমরা এখন এই সন্ত্রাসীদের জিম্মায়। সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, এই অত্যাচার থেকে আমাদের বাঁচান।”
এ বিষয়ে কথা হয় অভিযুক্ত সামছুল হক ওরফে পীর সাহেবের সাথে। তিনি অস্বীকার করে বলেন, এলাকায় থাকতে গেলে কিছু মানুষ উল্টাপাল্টা বলবে। আপনি খুঁজছেন কতটুকু জানি না। আমি এসবে নাই। আমি মাদ্রাসা বন্ধ করার কে। সেখানে সভাপতি যে ছিল সে দীর্ঘদিন ধরে কোন মিটিং আসেন না। তাই হুজুর রা ছুটি দিয়ে বাসায় গেছেন। ছুটি শেষ হলে চলে আসবে। কত দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে আমি জান না। কিছু একটা ঝামেলা আছে। আপনাদের সাথে পরে কথা হবে।
আরেক অভিযুক্ত শহীদুল্লাহ কাউসার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে জানতে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন আহমেদ অনীক এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।