নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় ১৫ বছর বয়সী কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতাসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিহত কিশোরীর মা বাদী হয়ে মাধবদী থানায় মামলা করেন। মামলায় নয় জনকে আসামি করা হয়েছে। এরপর রাতেই অভিযান চালিয়ে চার জনকে এবং শুক্রবার সকালে আরেকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন মহিষাশুড়া ইউপির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), তার ছেলে ইমরান দেওয়ান (৩২) এবং মো. ওবায়েদ উল্লাহ (৩৫), মূল অভিযুক্ত নূরার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব আলী (৩০) ও মো. গাফফার (৩৭)। তবে মূল অভিযুক্ত নূরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে৷
বিষয়টি নিশ্চিত করে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় নয় জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাধবদীর দড়িকান্দি এলাকার সরিষা ক্ষেত থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে লাশটি নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। নিহত কিশোরী সদর উপজেলার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের একটি এলাকার ভাড়াটিয়া। তার বাবা টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিক। ওই এলাকার একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন।
পুলিশ, নিহত কিশোরীর পরিবার ও মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত নূরা নামের এক তরুণের সঙ্গে কিশোরীর কথাবার্তা হতো। ১৫ দিন আগে ভাড়া বাসায় ফেরার পথে কিশোরীর মুখ চেপে ধরে তুলে নিয়ে যায় নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয় জন তরুণ। তখন তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের। এ ঘটনার বিচারের জন্য মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যায় কিশোরীর পরিবার। তবে বিচার পায়নি পরিবারটি। তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছিল।
স্বজনরা জানিয়েছেন, সাবেক মেম্বার ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান ধর্ষণের ঘটনাটি সালিশে মীমাংসা করার দায়িত্ব নেন। পরে তিনি অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা করে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে কোনও বিচার না করেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। পাশাপাশি ভুক্তভোগীর পরিবারকে গ্রাম ছাড়তে চাপ প্রয়োগ করা হয়। ঘটনার বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
পাশাপাশি সাবেক ইউপি সদস্যের কাছে অভিযোগ করায় ক্ষুব্ধ হয় নূরাসহ ওই তরুণরা। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার রাতে মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয় জন তরুণ ওই কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কিশোরীর সন্ধান পাননি পরিবারের সদস্যরা। সকাল সাড়ে ৯টায় খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বিলপাড় ও দড়িকান্দি এলাকার মাঝামাঝি একটি সরিষা ক্ষেতে কিশোরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে মাধবদী থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
নিহত কিশোরীর বড় ভাই বলেন, ‘মেম্বার বলছিল, মীমাংসা কইরা দেবো। মীমাংসার পর এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলছিল। আমরা তারে বলছিলাম, ১ তারিখে এলাকা ছেড়ে চলে যাবো। এরপরও চাপাচাপি করায় বুধবার রাত ৮টার দিকে আব্বা তারে (কিশোরী) নিয়া খালার বাড়ি যাচ্ছিল। পথে বিলপাড় এলাকা পার হওয়ার সময় তাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে নূরাসহ ছয় জন। পরে তারা আমার বোনকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সারাটা রাত তারে খুঁজছি। আজ সকালে সরিষা ক্ষেতে তার লাশ পাইলাম। আমরা মামলা করতে থানায় যাবো। যারা আমার বোনকে নির্যাতন করে হত্যা করলো, আমরা তাদের বিচার চাই।’
কিশোরীর বাবা বলেন, ‘গতকাল আমার সামনে থেকে মেয়েকে তুলে নিয়ে যায় নূরা ও তার সহযোগীরা। রাতে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও খোঁজ পাইনি। নূরা এই কাজ করেছে। আমি মেয়ের হত্যার বিচার চাই।’
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, ‘মহিষাশুড়ার সাবেক এক ইউপি সদস্যের কাছে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় নূরা নামের একজন ওই কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে তুলে নেওয়ার পর হত্যার এ ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের ঘটনায় বিচার চাইতে সাবেক ইউপি সদস্যের কাছে না গিয়ে থানায় আসা দরকার ছিল পরিবারটির। উলটো মেম্বার ও তাদের লোকজন গ্রাম ছাড়তে বলেছিল। ঘটনায় জড়িত মেম্বারসহ চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে।’
এ ঘটনায় ফেসবুক পোস্টে সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন লেখেন, ‘এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সকল অপরাধীকে গ্রেফতারের মাধ্যমে নিহত কিশোরীর পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। এর জন্য আমার সাধ্যের সবটুকু করবো। একজন অপরাধীকেও ছাড় দেওয়া হবে না।’
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
ওসি কামাল হোসেন বলেন, নয় জনকে আসামি করে মামলার পর এজাহারভুক্ত ৫ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রধান আসামি নূরাকে গ্রেফতারে থানা পুলিশসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অভিযান চালাচ্ছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


