আবির হোসেন সজল: উত্তরের দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর তিস্তা নদী। কৃষক, জেলে ও নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উজানের আগ্রাসনে ভাঙণে প্রতি বছর বসতভিটা ও আবাদী জমি হারিয়ে হাজারো পরিবার ঘরছাড়া হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায়নি। পানি সম্পদ উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প উদ্বোধন করা হবে। তবে ঘোষণার ১৭ দিন পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ শুরুর আলামত পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীকেন্দ্রিক পানিসংকট, নদীভাঙন ও কৃষি বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে এ মহাপরিকল্পনা ছিল বাঁচার শেষ আশার প্রতীক। চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকা মানুষের আশা এখন রূপ নিয়েছে হতাশা ও মহা বিরক্তিতে।
নদী রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোর নেতাদের অভিযোগ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ভূ-রাজনীতির মারপ্যাচে পড়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। তারা বলছেন, বারবার রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
তিস্তা নদী আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে মানুষকে শুধু আশার বাণী শোনানো হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জানুয়ারিতেই কাজ শুরুর কথা ছিল। পানি সম্পদ মন্ত্রী নিজেই ১ জানুয়ারির উদ্বোধনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৬ দিন পেরিয়ে গেলেও মাঠে কোনো কাজ নেই। এটি স্পষ্টভাবে ভূ-রাজনীতির মারপ্যাচে তিস্তা অববাহিকার মানুষের সঙ্গে মুলা ঝোলানো এবং প্রতারণা করা হচ্ছে।
তিস্তা পাড়ের বাসিন্দা জসিম সরকার বলেন, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা। বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করায় মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তিস্তা রক্ষা আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা জানান, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষকরা ফসল ফলাতে পারছেন না। বর্ষায় নদী ভাঙনে মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তিস্তার দ্পুাড়ে কর্মসংস্থানেসর মহাযজ্ঞ সৃষ্টি হবে এবং লাখো মানুষের বেকারত্ব লাঘব হবে। অন্যদিকে লাখো পরিবারের বসতভিটা ও ফসলি জমি নদী ভাঙণ থেকে রক্ষা পাবে।
নদীর তীরবর্তী সাহাবাজ গ্রামের কৃষক আহম্মদ আলী, সোবহান মিয়াসহ একাধিক কৃষক জানান, শুস্ক মওসুমে নদীতে পানি নাই। সেচের পানির সংকটে আবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে বর্ষায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটে নদীপাড়ের মানুষের।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু জানান, অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষনা দিয়েছিলো, চলতি মাসে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করবে। কিন্তু সরকার তার করলো না। রংপুরাঞ্চলের মানুষ বিগত সরকারের সময়ও অবহেলিত ছিল, এই সরকারের সময়ও তাই হলো। তিনি বলেন, নির্বাচন শুরু হয়ে গেছে। আমরা নির্বাচনের পর তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে রংপুরাঞ্চলের মানুষকে নিয়ে জোড়ালো আন্দোলন করবো।
তিস্তা অববাহিকার মানুষের প্রশ্ন একটাই ঘোষণার পর ঘোষণা নয়, কবে বাস্তব রূপ পাবে বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা। এ বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকল্প বিলম্বের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কারিগরি ও নীতিগত প্রক্রিয়া সম্পন্নের কাজ এখনও চলমান রয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


