ঢাকা: ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে, জ্বালানি সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে সরকার দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধের সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে বাড়িয়ে ৭টা নির্ধারণ করেছে। এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, অন্যদিকে জ্বালানি ব্যবহারে সংযম আনতেও সহায়ক হবে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা। এদিকে ব্যবসায়ীরা সময়সীমা রাত ৮টা পর্যন্ত করার দাবি জানালেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা আপাতত সরকারের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকার আগামী সময়ে ৩ থেকে ৩.৫ লাখ টন জ্বালানি তেল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও তা নিশ্চিত করা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অন্তত এক মাস জ্বালানি সাশ্রয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
জানা গেছে, দোকানপাট বন্ধের সরকারি সময় ছিল রাত ৮টা, যদিও বাস্তবে অনেক দোকান রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত খোলা থাকতে দেখা গেছে। প্রধান বিপণিবিতানগুলো সাধারণত রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে বন্ধ হলেও নতুন সিদ্ধান্তে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হবে।
নতুন সময়সূচি অনুযায়ী সরকারি অফিস বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকায় অফিস শেষে ক্রেতাদের হাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় থাকছে কেনাকাটার জন্য। এতে করে কর্মজীবী মানুষের জন্য কেনাকাটা সহজ হবে এবং বিকেলের ব্যস্ত সময়ে বাজারে ক্রেতা উপস্থিতি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে সন্ধ্যা ৬টায় দেশের সব দোকানপাট ও শপিং মল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা। তবে রাত আটটা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ চেয়ে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি অনুরোধ জানান বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতারা।
তারা বলেন, প্রয়োজনে সকাল ৯টার পরিবর্তে বেলা ১১টায় দোকানপাট খুলতে চান। তবে সন্ধ্যা ছয়টার পরিবর্তে রাত আটটা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ চান তারা।
রমনা ভবন বনিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: হারুন-উর রশিদ বলেন, আমরা এখনও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও আরো যারা আছেন তাদের সাথে আলাপ করে যাচ্ছি। আমরা বলেছি, সন্ধ্যার ৬টার পরিবর্তে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত হলে আমাদের জন্য ভালো হয়। প্রয়োজনে আমরা সকালের পরিবর্তে দুপুর থেকে দোকান পাট খুলব।
কিন্তু সন্ধ্যার সময়টা আমাদের দিতে হবে। এজন্য সরকার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় দিয়েছে, আমরা তাতে সন্তুষ্ট।
এ বিষয়ে গুলিস্তানের বেল্টের গলিতে দোকান করেন মো: নূর নবী হাওলাদার। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। যদি বেচা বিক্রি করতে না পারি তাহলে আমাদের পরিবারসহ বিভিন্ন লিংকেজ শিল্প কারখানায়ও প্রভাব পড়বে। সরকার আগে যেটা করছিল সেটা আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যাসায়ীদের ওপর অন্যায়। তবে সরকার ৬টার পরিবর্তে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় বাড়ানোয় আমরা সন্তুষ্ট। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত হলে আমাদের ভালো হতো। আর আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তারা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেটা অনেক।
পীর ইয়ামেনি মার্কেটের কামাল শাড়ি বিতানের মালিক মো. শাহজাহান বলেন, বর্তমানে আমরা একটা জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা ভালো একটা উদ্যোগ। আমাদের প্রত্যেককে মানা উচিৎ। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত হলে আমাদের ব্যবসাটা ভালোভাবে করতে পারতাম। যাইহোক আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই, এতে আমাদের লোকসান হলেও বৃহত্তর স্বার্থে, দেশের স্বার্থে আমরা এটা করবো।
সদরঘাটের গ্রেটওয়াল মার্কেটে ব্যবসায়ী মো. শিপন খান। তিনি বলেন, ঈদের পর ব্যবসা বাণিজ্য এমনিতেই কম। তারপর যদি ৭টায় বন্ধ করতে হয় ব্যবসা হবে না। ব্যবসা না হলে কর্মচারীদের বেতন দেব কিভাবে। তবে এটা যেমন সত্য তেমনি জ্বালানি সংকটে নিয়ন্ত্রণে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটা যদি রাত ৮টা পর্যন্ত হতো তাহলে ভালো হতো।
রাজধানীর নিউমার্কেটে সেলাইয়ের কাজ করেন মো. আলী আজগর। তিনি বলেন, এখানে ১০ বছর ধরে কাজ করে খাই। দিনে কাজ নেই রাতে কাজ সম্পন্ন করি। ৬টায় বন্ধ করলে কোনো কাস্টমার পাব না। কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। আর যদি কাজ না করতে পারি তাহলে সংসার কিভাবে চলবে। সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটাকে সহায়তা করতে চাই। কিন্তু আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের কথা চিন্তা করতে হবে সরকারকে। আর যে সংকট হচ্ছে সেটাতো শুধু আমাদের দেশে একা না সারা বিশ্বেই হচ্ছে। তবে সরকার এখন ৭টা পর্যন্ত সময় দিয়েছে এতে সন্তুষ্ট আমরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, সরকারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ রেখে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো। সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে ৭টা করায় কিছুটা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকলেও এতে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। বরং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি সচল থাকবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।
তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য আনতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী নতুন সরকারের সময়ে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছেন। তাই দোকান খোলা রাখার সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়। তাই নির্ধারিত সময়সীমা বজায় রাখলে আলোকসজ্জা ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। এতে করে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। আর এই সময়সীমা অন্তত এক মাস কার্যকর থাকলে জ্বালানি সাশ্রয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে দোকান খোলার সময় আরও বাড়ানো যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ দোকানমালিক সমিতির সভাপতি মো: হেলাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দোকানপাট বন্ধের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোয় সন্তোষ প্রকাশ করছি। নতুন সময়সূচি ব্যবসায়ীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে। এই এক ঘণ্টা বাড়ানো আমাদের টিকে থাকতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন এবং পরবর্তীতে দোকান বন্ধের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসে। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
দোকান খোলার সময় কমে যাওয়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বড় ধরনের বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা কম। রমজান ও ঈদুল ফিতরের স্বল্প সময়ের কারণে বাজারে ক্রেতা উপস্থিতিও সীমিত। তবে সামনে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কিছুটা ছাড় দেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, পহেলা বৈশাখের আগে তিন দিন দোকান খোলা রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। এছাড়া কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা ১৫ দিনের জন্য বাড়তি সময় চেয়েছেন।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি বলেন, মূল সংকটটা হয় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। এর বাইরে বিদ্যুৎ সরবরাহে তেমন সমস্যা নেই। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের স্বার্থে ব্যবসায়ীদের সরকারের পাশে দাঁড়ানো উচিত। একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ে সবাইকে সচেতন ভূমিকা রাখার আহবান জানান তিনি।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সংকট শুধু জ্বালানিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি পরিবহন, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষিতে প্রভাব পড়লে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং পণ্যের দাম বাড়বে, যা বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে। এ প্রেক্ষিতে তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীসহ সকলের প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানান। যেভাবে সম্ভব বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া যানবাহন ব্যবহার কমাতে হবে।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দোকান মালিক সমিতি আমাদের কাছে একটি আবেদন করেছিল- যাতে তাদেরকে কমপক্ষে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ দেই। যদিও মন্ত্রিসভা বৈঠকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী দোকান মালিক সমিতির আবেদন এবং অনুরোধ বিবেচনা করে পুনর্মূল্যায়ন করে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। অবশ্যই জরুরি সেবা যারা দেয়, তারা এর আওতার বাইরে থাকবে।
তিনি বলেন, আগামী তিন মাসের জন্য জ্বালানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। এপ্রিল মাসের ডিজেলের চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তিন মাসের অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদা অনুযায়ী ও মজুদ আছে। কোন কৃষক ডিজেল পেতে সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে কিছু অসাধু চক্র দেশে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।একই সঙ্গে জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান তিনি।
জানা গেছে, গত ৩ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ চেইনে অনিশ্চয়তা ও দামের ওঠানামা মোকাবিলায় দেশের সব ধরনের মার্কেট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। জরুরি প্রয়োজনে খাবারের দোকান, ওষুধের দোকানসহ প্রয়োজনীয় সেবা এ সিদ্ধান্তের বাইরে থাকবে বলে জানানো হয়েছিল।
ওইদিন সরকারি ও বেসরকারি সব অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে সরকার। ব্যাংকিং কার্যক্রম চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত। আর বিকাল ৪টায় ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যুদ্ধের কারণে সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আনার উদ্যোগ চলছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


