জুমবাংলা ডেস্ক : পুষ্টিগুণসম্পন্ন ড্রাগন ফল আকারে কীভাবে বড় করা হয়–এ নিয়ে তুমুল আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিষাক্ত ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহারে ড্রাগন ফল এত বড় হচ্ছে দাবি করে নানান ভিডিও কন্টেন্ট বানাচ্ছেন অনেকে। বলা হচ্ছে, এক ধরনের ‘টনিক’ ব্যবহার করে আকারে বড় করা হচ্ছে ড্রাগন ফল এবং তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। তবে কৃষিবিদরা বলছেন, এই তথ্য ভুল। আপেল, নাশপাতি বা মিষ্টি চেরির মতোই ড্রাগন চাষে ব্যবহার করা হয় ‘প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটর’ বা পিজিআর। এর ব্যবহার আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

ড্রাগন ফল

Advertisement

এছাড়া সম্প্রতি পরীক্ষা করা ড্রাগন ফলে কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কোনও নমুনা পাওয়া যায়নি বলেও জানান কৃষিবিদরা।

দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে ড্রাগন ফলের জন্ম। সেখান থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ভিয়েতনামে ড্রাগন ফলের বীজ নিয়ে আসা হয়। এরপর ধীরে ধীরে শুরু হয় ড্রাগন ফলের চাষ, বাড়তে থাকে প্রসার। বর্তমানে ভিয়েতনামে এই ফল ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, ভারত, মালয়েশিয়া, চীন, ইসরাইল, মেক্সিকো, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে সফলভাবে ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে।

ড্রাগন ফলের গাছ এক ধরনের ক্যাকটাস জাতীয়। এই গাছ সাধারণত দেড় থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু ড্রাগন ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বন্যামুক্ত প্রায় সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফলের চাষ করা যায়। বর্তমানে ঢাকা, নাটোর, গাজীপুর, পাবনা, বগুড়া, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, রাজশাহী, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের বাগান আছে এবং দেশের অন্যান্য এলাকায়ও এর চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত ড্রাগন ফলের নতুন জাতটি হলো বারি ড্রাগন ফল-১। এর আকার বড়, পাকলে খোসার রঙ লাল হয়ে যায়। শাঁস গাঢ় গোলাপি রঙের, লাল ও সাদা এবং রসালো প্রকৃতির। ফলের বীজগুলো ছোট ছোট কালো ও নরম। একটি ফলের ওজন ১৫০ গ্রাম থেকে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ঔষধি ও উচ্চ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ সুস্বাদু এ ফল কাঁচা-পাকা উভয় অবস্থায়ই খাওয়া যায়। এতে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল ও আঁশ আছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, ড্রাগন ফল একটি পরিপূর্ণ খাবার, যা ভাত-রুটির মতো মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটায়। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভাতের পরিবর্তে এ ফল উত্তম। তাইওয়ানের চিকিৎসকরা ডায়াবেটিস রোগীদের ভাতের বদলে এ ফল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এই ফল ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এর শাঁস পিচ্ছিল ও আঁশ সমৃদ্ধ হওয়ায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং পাইলস ও ফিস্টুলা নিরাময়ে সহায়তা করে।

এছাড়া এ ফল কোলেস্টরেল ও ব্লাডপ্রেসার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং শরীরের চর্বি হ্রাস করে। ড্রাগন ফল চোখের সুস্থতা, হজম শক্তি ও বিপাকীয় কাজে সহায়তা করে। এ ফল মজবুত হাড়, মসৃণ ত্বক, সুস্থ দাঁত ও শরীরের কোষ কলা গঠনসহ ক্ষত নিরাময়, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতে, হৃদরোগ প্রতিরোধে, ক্যানসার নিরাময় ও স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। ড্রাগন ফল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের ভাঁজ পড়া দূর করে এবং শরীরের স্বাভাবিক বার্ধক্য বিলম্বিত করে। এ ফলের পেস্ট চুলের স্বাস্থ্য রক্ষা করে ও চুল পড়া রোধ করে।

কানাডার কৃষি কাজে ব্যবহার করা গাইডলাইনে ‘প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটর’-এর ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে। চাষাবাদে কীভাবে এই উপাদান ব্যবহার করা দরকার এবং ব্যবহার করলে কী ফল পাওয়া যাবে তার সবই উল্লেখ করা আছে। সেখানে বলা হয়েছে– উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক বা পিজিআর হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ফল অপসারণ বা ফলের পরিপক্বতা পরিবর্তন করতে ব্যবহৃত হয়। ফাইটোহরমোনের মতো কাজ করে এই পিজিআর। এটি উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলো প্রভাবিত করে। আফ্রিকায় আলু, টমেটো ও পেঁয়াজের মতো শাকসবজি চাষেও পিজিআর ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকার পর ইউরোপে এই রাসায়নিকের ব্যবহার বেশি।

পিজিআর পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত। এগুলো হলো- অক্সিন, গিবেরেলিন ও গিবেরেলিন জৈব সংশ্লেষণের ইনহিবিটারস সম্পর্কিত যৌগ, সাইটোকিনিন্স, অ্যাবসিসিক অ্যাসিড এবং ইথিলিন স্থিতিকে প্রভাবিত করে এমন যৌগগুলো।

আপেলের বৃদ্ধিতে নিয়ন্ত্রকের ব্যবহার সম্পর্কে উল্লেখ করা আছে, প্রোমালিন এবং পারলান, যেটি দুই ধরনের পিজিআরের সংমিশ্রণ, যা আপেলের আকৃতি উন্নত করতে ব্যবহৃত হয়। একই রাসায়নিকের মিশ্রণ নাশপাতির আকৃতি বড় করতেও ব্যবহৃত হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মেহেদি মাসুদ বলেন, বাজারে ড্রাগন ফল নিয়ে যে অপপ্রচার হচ্ছে সেটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ, পৃথিবীর সব দেশে ফল বড় করা এবং ফুল বেশি হওয়ার জন্য পিজিআর ব্যবহার করা হয়। এই নিয়ন্ত্রকের মধ্যে একটি জিবরেলিক এসিড। এর ১৩৬টি প্রকার আছে। তার মধ্যে জিএ-৩, জিএ-৪ এবং জিএ-৭ ফল বড় করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে ফাইটোহরমনগুলো ব্যবহারে কোনও স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। ২০১৪ সালে মালয়েশিয়ায় ড্রাগন ফলে জিএ-৩ ব্যবহার করা হয় আকারে বড় করার জন্য। গবেষণার জন্য তারা বিভিন্ন মাত্রায় এটি ব্যবহার করেছে। সেখানে দেখা গেছে, অব্যবহৃত ফলের চেয়ে ব্যবহৃত ফলের আকার দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ ‘সি’ গ্রেডের ফলকে ‘এ’ গ্রেডে রূপান্তর করা যায়।

তিনি আরও বলেন, পিজিআরের সুবিধা বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন প্রথম ১৯৩০ সালে। সেই থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং বিশেষ করে ২০২২ সালে ভিয়েতনামের দুই জন বিজ্ঞানী জার্নালে উল্লেখ করেছেন মালয়েশিয়ার গবেষণার মতো একই ফলাফল। এজন্য পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে কিউই, আপেল, চেরি, আঙ্গুর বৃদ্ধিতে ফাইটোহরমন ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানের এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে যদি আমাদের চাষি ভাইয়েরা ফলের আকার বড় করেন, সেখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। কারণ, এটি প্রাকৃতিক এবং অরগানিক সাবস্টেন্স। একটা সম্ভাবনাময় ফল কিছু অতি উৎসাহী ইউটিউবারের কারণে তো ধ্বংস হতে পারে না।

কৃষিবিদদের মতে, ড্রাগন বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ফল। ২০১৪ সালে এর ফলন ৬৬ টন হলেও এই বছর ২৫ হাজার ৭০০ টন উৎপাদিত হয়েছে।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেল ঢাকার রিকশাচিত্র

গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারে ড্রাগন ফলে কীটনাশকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। তাতে ক্ষতিকারক কোনও কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.