কুখ্যাত জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে কথিত সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্টলেডি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ইতিমধ্যে তিনি কংগ্রেসের একটি কমিটির সামনে হাজির হন। সেখানে তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হয়। হিলারি অভিযোগ করেন, রিপাবলিকান সদস্যরা তাকে টার্গেট করছেন, যাতে দণ্ডিত যৌন অপরাধী এপস্টেইনের সঙ্গে ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক থেকে মনোযোগ সরানো যায়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি বৃহস্পতিবার এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রশ্নের জবাব দেন। তার একদিন পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও হিলারির স্বামী বিল ক্লিনটেনেরও হাজির হওয়ার কথা।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন আইন মন্ত্রণালয় এপস্টেইন-সংক্রান্ত লক্ষাধিক নথি প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, ২০০৮ সালে শিশু যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও বহু উচ্চপ্রোফাইল ব্যক্তি, যাদের মধ্যে সাবেক ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স অ্যানড্রুও আছেন, তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
বৃহস্পতিবারের সাক্ষ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
‘কাকে রক্ষা করা হচ্ছে?’
উদ্বোধনী বক্তব্যে হিলারি ক্লিনটন প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটি এবং এর রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের জন্য সত্য ও ন্যায়বিচার খোঁজা নয়। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি জানি না কতবার বলতে হয়েছে- আমি জেফ্রি এপস্টেইনকে চিনতাম না। আমি কখনও তার দ্বীপে যাইনি। তার বাড়িতে যাইনি। তার অফিসেও যাইনি। তিনি আরও বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠরা যদি সত্যিই সিরিয়াস হতো, তাহলে সময় নষ্ট করে ‘ফিশিং এক্সপেডিশন’ চালাত না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি আছে। কী লুকিয়ে রাখা হচ্ছে? কাকে রক্ষা করা হচ্ছে? আর এই গোপনীয়তার কারণ কী?
‘আমাকে ইউএফও নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে’
হিলারি ক্লিনটনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নগুলো ছিল ‘পুনরাবৃত্তিমূলক’। অর্থাৎ একই প্রশ্ন বার বার করা হয়েছে। তিনি বলেন, একই প্রশ্ন বারবার করা হয়েছে, যা আমার কাছে খুব ফলপ্রসূ মনে হয়নি। বৈঠকের শেষ দিকে প্রশ্নের ধরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, পরিস্থিতি বেশ অদ্ভুত হয়ে গিয়েছিল। কারণ আমাকে ইউএফও নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু হয়, আর ‘পিজ্জাগেট’ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হয়- যা সবচেয়ে জঘন্য ভুয়া ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর একটি।
‘পিজ্জাগেট’ বলতে ২০১৬ সালে ছড়িয়ে পড়া সেই মিথ্যা ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে বোঝানো হয়, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে ওয়াশিংটন ডিসির একটি পিজ্জার দোকান শিশু যৌন পাচারচক্রের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যা নাকি ক্লিনটন পরিচালনা করতেন। এমনকি নিউইয়র্ক পুলিশ ডেমোক্রেটদের সঙ্গে যুক্ত একটি শিশু যৌনপাচার চক্র আবিষ্কার করেছে, এমন দাবিও ছড়ানো হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া ছবিতে সাময়িক স্থগিত
সাক্ষ্যগ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়, যখন কমিটির রিপাবলিকান সদস্য লরা বোয়েবার্ট কক্ষের একটি ছবি ফাঁস করেন। রক্ষণশীল প্রভাবশালী ব্যক্তি বেনি জনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্সে ছবিটি প্রকাশ করে লেখেন- ক্লিনটনকে ‘খুশি মনে হচ্ছে না’।
ক্লিনটনের আইনজীবী দলের অনুরোধে শুনানি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। রুদ্ধদ্বার কংগ্রেসীয় শুনানিতে ছবি তোলা বা প্রকাশ করা নিয়মবিরুদ্ধ। হিলারি ক্লিনটন বলেন, রুদ্ধদ্বার শুনানি হবে- এই শর্তে আমরা নিয়মে সম্মত হয়েছিলাম। কিন্তু একজন সদস্য সেই নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। এতে আমরা উদ্বিগ্ন হয়েছি, কারণ এতে বোঝা যায় তারা অন্য চুক্তিও ভঙ্গ করতে পারেন। তিনি জানান, তিনি নিজে চান শুনানি প্রকাশ্যে হোক।
‘তাকে শপথের অধীনে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন’
কমিটির শীর্ষ ডেমোক্রেট সদস্য, ক্যালিফোর্নিয়ার রবার্ট গার্সিয়া বলেন, ট্রাম্প ও তার বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিককে এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সাক্ষ্য দিতে ডাকা উচিত। লুটনিক স্বীকার করেছেন যে, সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলার পরও তিনি এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে গিয়েছিলেন। এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক প্রেসিডেন্টের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও ট্রাম্প সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একসময় তারা বন্ধু ছিলেন, তবে ট্রাম্প দাবি করেন, মারে লাগো ক্লাব থেকে তিনি এপস্টেইনকে বের করে দেন। কারণ ওই অর্থলগ্নিকারী নাকি তার কর্মীদের ‘চুরি’ করছিলেন। হিলারি ক্লিনটন বলেন, যদি এই কমিটি সত্যিই এপস্টেইনের মানবপাচার অপরাধ সম্পর্কে সত্য জানতে চায়, তাহলে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করে বর্তমান প্রেসিডেন্টের জবাব নেয়ার ওপর নির্ভর করবে না। তাকে শপথের অধীনে সরাসরি জিজ্ঞেস করবে- এপস্টেইন নথিতে তার নাম যে হাজার হাজারবার এসেছে, সে বিষয়ে।
কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান জেমস কমার বলেন, লুটনিককে সমন জারি করা ‘সম্ভব’। তবে ট্রাম্পকে হাজির করার ধারণা তিনি নাকচ করেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এপস্টেইন নিয়ে শত শত, যদি না হাজারো প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তিনি নথি প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ছিলেন।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
স্বামীর বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হিলারি
শুক্রবার বিল ক্লিনটনের সাক্ষ্য দেয়ার কথা রয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে তার সঙ্গে এপস্টেইনের সামাজিক সম্পর্ক ছিল- যেমনটি ট্রাম্পসহ আরও অনেক প্রভাবশালী পুরুষের ক্ষেত্রেও ছিল। বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক জানতে চান, এপস্টেইনের প্রথম গ্রেপ্তারের আগের সময় স্বামী তার অপরাধ সম্পর্কে কিছু জানতেন না- এ বিষয়ে তিনি কি শতভাগ নিশ্চিত? হিলারি ক্লিনটন জবাব দেন, আমি নিশ্চিত। ঘটনাক্রম দেখলেই বোঝা যায়, এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার বহু বছর আগেই তার সঙ্গে বিলের যোগাযোগ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ক্লিনটন দম্পতির শুনানি রুদ্ধদ্বার হলেও, উভয়ের সাক্ষ্যের লিখিত প্রতিলিপি ও ভিডিও পরে প্রকাশ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


