মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার টানগোপালনগর গ্রামের সৌদি আরব প্রবাসী এক যুবক ছুটিতে দেশে ফেরার পর স্থানীয় চাঁদাবাজ প্রতারক ও লুটেরা গ্যাংয়ের কবলে পড়ে অর্থ, স্বর্ণ ও মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোনসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিষপত্র লুট ও মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতারক চক্রের টানা নির্যাতন ও হুমকি সহ্য করতে না পেরে গোপনে সৌদি আরবে ফিরে যেতে বাধ্য হন বলে দাবি করেন লিয়াকত আলী সুমন নামের ওই প্রবাসী।

ভুক্তভোগী লিয়াকত আলী সুমন সিংগাইর উপজেলার শায়েস্তা ইউনিয়নের টানগোপালনগর গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন এবং সেখানেই একটি ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
সম্প্রতি ছুটিতে দেশে ফেরার পর শুরু হয় তার ওপর অমানসিক নির্যাতন, হুমকি, মারধর ও লুটপাট। পরে বাধ্য হয়ে গোপনে সৌদি আরবে ফিরে যান তিনি। সৌদি আরবে ফিরে একাধিক ভিডিও বার্তায় এই প্রতিবেদককে এসব তথ্য জানান লিয়াকত আলী সুমন।
ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, প্রায় তিন বছর আগে সালমা নামের এক নারীর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্ক করে বিয়ে করেন লিয়াকত। বিয়ের বেশ কিছুদিন পর ফিরে যান সৌদি আরবে। এরপর থেকেই এলাকার কয়েকজন বখাটে ও মাদকসেবীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেন সালমা বেগম। এদের মধ্যে শাকিব নামের এক যুবকের সঙ্গে পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন সালমা বেগম। কিছুদিন পর লিয়াকত আলী সুমন দেশে ফেরার পর স্থানীয় রোমান মৃধা, কিরণ, নিলয় মন্ডল (নিলা)সহ কয়েকজন সালমা বেগমের সহযোগিতায় জোরপূর্বক লিয়াকতের ঘরে প্রবেশ করে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ভিডিও ধারণ করে এবং ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করে। এরপর শুরু হয় শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন। একপর্যায়ে চক্রটি প্রবাসী লিয়াকতের কাছে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার দাবি করে। তাদের কাছ থেকে থেকে রক্ষা পেতে চাচাতো বোন রিনা আক্তার এবং তার জামাতা নূর ইসলামকে ফোন দিয়ে তাদের সহযোগিতা চায় এবং তাদের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয় লিয়াকত। সেখানে গিয়ে চাচাতো বোন ও তার জামাতার কছে নিজের পাসপোর্ট, সৌদি আরবের বৈধ আবাসিক ও ওয়ার্ক পারমিট কার্ড (আকামা), ব্যাংক কার্ড, নগদ টাকা, স্বর্ণের চেইন ও আংটিসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিষপত্র জমা রাখে। পরদিন তাদেরকে ওই প্রতারক চক্রের সাথে যোগাযোগ করতে দেখে সন্দেহ হয় লিয়াকতের। পরে তার গচ্ছিত জিনিষপত্র ফেরত নিয়ে অন্যত্র সড়ে যেতে চাইলে সেগুলো দিতে অস্বীকৃতি জানায় নূর ইসলাম ও তার স্ত্রী রিনা। পরে সেখান থেকে পালিয়ে গোপালনগর গ্রামের সিদ্দিক মৃধার বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন লিয়াকত। পরদিন দুপুরে ফেসবুকে লাইভ করে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন লিয়াকত। এরপর জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সহযোগিতা চাইলে সিংগাইর থানার সহকারী সহকারি উপ-পরিদর্শক মো. শরীফ হোসেন সেখানে গিয়ে নূর ইসলাম মেম্বারের কাছ থেকে লিয়াকতের পাসপোর্ট, আকামা, ব্যাংক কার্ড, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার সহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিষপত্র উদ্ধার করে দেন।
ভিডিও বার্তায় লিয়াকত আলী সুমন আরো জানান, মাহমুদ হাসান গোলাপ মৃধা, মাহফুজ হাসান সিয়াম মৃধা, রোমান মৃধা, কিরণ, শাকিব, নিলয় (নিলা), নূর ইসলাম চক্রের কবল থেকে মুক্তি পেতে উপজেলার গোবিন্দল গ্রামের এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। যেদিন বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিতে যান সেই রাতেই বন্ধুর বাড়িতে বাউল গানের রিহার্সেল হচ্ছিল। রাত দুইটার দিকে লিয়াকতের বন্ধু উজ্জল হোসেন দোকানে যাওয়ার কথা বলে লিয়াকতকে স্থানীয় একটি ইটভাটার পাশে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে গভীর রাতে আবারও রোমান মৃধা, শাকিব, নিলয় (নিলা) ও সিয়ামসহ চক্রের আরো কয়েকজন সদস্যদের দেখতে পান ভুক্তভোগী লিয়াকত। এতে তার বন্ধু উজ্জলের সঙ্গে ওই প্রতারক চক্রের যোগসাজশ থাকতে পারে বলে সন্দেহ হয় তার। চক্রটি তখন লিয়াকতকে হত্যার হুমকি দিলে সে ভয় পেয়ে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ইটভাটায় গিয়ে শ্রমিকদের কাছে প্রাণ বাঁচানোর জন্য সহযোগিতা চান। ইটভাটার শ্রমিক, সর্দার ও ম্যানেজার তাকে আশ্রয় দেয় এবং সকাল হলে পুলিশের সহযোগিতা নিতে বলে। এভাবে যেখানেই যান সেখানেই প্রতারক ও চাঁদাবাজ চক্রের হুমকি পেয়ে কিছুদিন গোপনে ঢাকায় বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করেন লিয়াকত। এরপর প্রয়োজনীয় প্রসেসিং সম্পন্ন করে আবারও সৌদি আরবে ফিরে যান তিনি।
লিয়াকত আলী দাবি করেন, দেশে ফেরার পর থেকেই তাকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে রাখার চেষ্টা করতো স্ত্রী সালমা বেগম। ১৯ দিন পর বিষয়টি বুঝতে পেরে স্ত্রীর আচরণ ও কর্মকাণ্ডে সন্দেহ হলে স্ত্রীর মোবাইল ফোন চেক করে স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন তিনি। এ বিষয়ে স্ত্রী সালমা বেগমকে জিজ্ঞাসা করলে সে অসুস্থ হওয়ার ভান করে সিংগাইরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং রোমান মৃধা, কিরণ, শাকিব, নিলয় সহ কয়েকজনকে ডেকে এনে লিয়াকতকে ভয়ভীতি দেখায়। পরে লিয়াকত আলী বুঝতে পারেন, তার স্ত্রী সালমা বেগম বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ওই চক্রটির সহযোগিতায় আত্মসাৎ করেছে। পরে স্ত্রী সালমা বেগমের সহযোগিতায় চক্রের সদস্যরা তার ঘরে প্রবেশ করে তাকে মাদকসহ সাজানো ভিডিও ধারণ করে এবং হত্যা ও বিভিন্ন মামলায় ফাসানোসহ ভিডিও ভাইরাল করার হুমকি দিয়ে সিয়াম মৃধা ও গোলাপ মৃধার নেতৃত্বে চক্রটি দুই দফায় ১৫ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং ইয়ামাহা ব্রান্ডের একটি আর১৫ মডেলের বাইক, দুইটি আইফোন, দুইটি এন্ড্রয়েড ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে নেয়। নগদ টাকা আদায় করতে লিয়াকতের সাথে চারিগ্রাম ও চান্দহর এলাকায় অবস্থিত দুইটি ব্যাংকের শাখায় যায় সিয়াম মৃধাসহ চক্রের কয়েকজন সদস্য।
তিনি আরো দাবি করেন, গোপনে সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার পরও গোলাপ মৃধা, সিয়াম মৃধা, রোমান মৃধা, শাকিব ও নুর ইসলামসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যরা তাকে ফোন দিয়ে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছেন। দেশে ফিরলেই তাকে হত্যা করা হবে বলে ফোনে হুমকি দিচ্ছে তারা।
লিয়াকত আলী বলেন, আমি দেশে ফিরে শান্তিতে বসবাস করতে চাই। কিন্ত রোমান মৃধা, কিরণ, শাকিব, নিলয়সহ চক্রের অন্যান্য সদস্যের প্রতিনিয়ত হুমকির কারণে আমি দেশে ফিরতে ভয় পাচ্ছি। আমি দেশে ফিরলে তারা যেকোন সময় আমার বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। আমি প্রাণ বাঁচাতে প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চাই। আমার কষ্টার্জিত টাকা ও লুট হওয়া মালামাল ফেরত পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।
বাবা-মা বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিয়েছে কি’না জানতে চাইলে তিনি জানান, বড়ভাই কুয়েত প্রবাসী এবং বোন স্বামীর সাথে দুবাই প্রবাসী। তার বাবা সিংগাইর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। কিন্ত এখন পর্যন্ত তার লুট হওয়া অর্থ, অন্যান্য জিনিষপত্র উদ্ধার হয়নি। এসময় তিনি পুলিশের সহযোগিতা চেয়ে আকুতি জানান।
লিয়াকত আলীর দাবি করা এসব বিষয়ে সরেজমিনে খোঁজ নিতে গিয়ে কথা হয় মেসার্স কেবিসি ইটভাটার কয়েকজন শ্রমিকের সাথে। ভাটা শ্রমিকরা জানান, কয়েকমাস আগে রাত দুইটার দিকে লিয়াকত আলী নামের এক যুবককে কয়েকজন লোক ধাওয়া করলে সে আমাদের ভাটায় এসে আশ্রয় নেয়। সেসময় তার সারা শরীরে কাঁদা মাখানো ছিল এবং পায়ে কোন জুতা ছিলনা। পরে আমরা চার-পাঁচ জন মিলে তাকে উদ্ধার করে আশ্রয় দেই এবং তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি।
সিংগাইর থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক মো. শরীফ হোসাইন জানান, কয়েক মাস আগে ৯৯৯-এ কল পেয়ে নুর ইসলাম মেম্বারের কাছ থেকে এক প্রবাসীর পাসপোর্ট, আকামা, স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে মোটরসাইকেল, টাকা, মোবাইল ফোন বা অন্যান্য জিনিষপত্র হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।
সোনালী ব্যাংকের সিংগাইরের চান্দহর শাখার ব্যবস্থাপক জুবায়ের আহমেদ অনিক বলেন, ওই প্রবাসীর একাউন্টে প্রায় কোটি টাকার মতো ছিল। আরটিজিএস এবং ক্লিয়ারিং এর মাধ্যমে সেই টাকা অন্য একাউন্টে সড়িয়ে নিয়েছে। আর ৬ লাখের মতো ক্যাশ টাকা উঠিয়ে নিয়েছে। সেসময় তিন চারজন লোক ছিল তার সাথে। ব্যাংকের ভেতরে সন্দেহজনক কিছু ঘটেনি। ব্যাংকের বাহিরে কিছু হয়েছে কি’না সেটি আমার জানা নেই।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা। উজ্জল হোসেন বাবু বলেন, লিয়াকত আমকে ফোন দিয়ে বলেছিল তার বাড়িতে থাকতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। পরে হঠাৎ একদিন আমার বাড়িতে এসেছিল, রাতের বেলা বাইরে বের হয়ে ইটভাটার কয়েকটা ভ্যানের লাইট দেখে পোলাপান ধরতে আসছে বলতে বলতে ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। আসলে সেগুলো ছিল ইটভাটার ভ্যানের লাইট। পরে আমাকে দোষারোপ করে সে কোথায় যেন চলে গেছে। আমাকে মিথ্যা অপবাদ দেয়ায় তার সাথে আমার আর যোগাযোগ নেই।
এদিকে নুর ইসলাম মেম্বার দাবি করেন, লিয়াকত আমার চাচাতো শ্যালক। তার স্ত্রীর সাথে ঝামেলা হলে স্ত্রী সিংগাইর গিয়ে অপহরণের নাটক সাজায়। পরে খবর পেয়ে আমরাই তাকে উদ্ধার করি। এরপর সে তার পাসপোর্ট ও স্বর্ণালঙ্কার আমার স্ত্রীর কাছে জমা রাখে। আমার ছেলের কাছ থেকে একটা মোবাইল নিয়ে কিছু টাকা বাকি রেখেছিল। পরে ঝামেলা হলে স্থানীয় মুরুব্বিদের সামনেই সেই টাকা দিয়েছে এবং তার জিনিষপত্র সে বুঝে নিয়েছে। অন্য কিছু লোকের সাথে ঝামেলা করে সেই দোষ আমাদের ওপর চাপাচ্ছে। ও একটা মাদকাসক্ত। নেশা করে উল্টা পাল্টা কথা বলে। ও কি বলে নিজেও জানেনা।
অভিযুক্ত কিরণ বলেন, কিছুদিন আগে লিয়াকত ফোন দিয়ে বলতেছে তার স্ত্রী লোকজন নিয়ে তাকে আটকিয়েছে। পরে আমরা কয়েকজন গিয়ে তাকে উদ্ধার করে তার চাচাতো বোন জামাই নুর ইসলামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেই। সেখান থেকে সে না বলে মৃধা বাড়িতে চলে যায় এবং বলে আমাকে মেরে ফেলবে। এরপর ৯৯৯ এ কল দেয় সে। পরে পুলিশ সহ ১৫-২০ জন গিয়ে তাকে উদ্ধার করেছি। এখন সেই ছেলে আমার নামে উল্টাপাল্টা কথা বলতেছে, এটা খুবই দুঃখজনক। ওর পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলে দেইখেন, আমার দ্বারা তাদের কোন ক্ষতি হয়েছে নাকি। অন্য কোন লোকের সাথে তার ঝামেলা হয়েছে কিনা সেটা তো আমার জানা নাই, এর জন্য সে আমাকে দোষারাপ করতে পারে না।
সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন আগে সে ৯৯৯ এ কল করে সহযোগিতা চাইলে পুলিশ পাঠিয়ে তাকে সহযোগিতা করা হয়েছে। কিন্ত পরবর্তীতে টাকা বা অন্যান্য জিনিষপত্র লুটের ঘটনায় পুলিশকে জানায়নি বা কোন অভিযোগ করেনি। এ বিষয়ে সে লিখিত অভিযোগ দিলে বা আইনি সহযোগিতা চাইলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


