জুমবাংলা ডেস্ক : প্রায় এক দশক পর তেতে ওঠা প্রকৃতি যেন রেহাই দিচ্ছে না। কেননা, তীব্র তাপপ্রবাহে নাকাল দেশবাসীর জন্য এখনই তেমন কোনো সুখবর নেই আবহাওয়াবিদদের কাছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টিপাতের আভাস মিললেও সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে কালবৈশাখীর প্রবণতা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতিমধ্যে দক্ষিণা বাতাস বইছে, যা সাগর থেকে জলীয় বাষ্প আনা শুরু করেছে। এতে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলেও সেটা খুব কম। তবে এ সম্ভাবনা বেড়ে ১৯ কিংবা ২০ এপ্রিলের দিকে হালকা বৃষ্টিপাত হতে পারে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে আপাতত বৃষ্টিপাতে সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে ২১ এপ্রিল পর বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। এ সময় কোথাও কোথাও তীব্র কালবৈশাখী ঝড়ও হতে পারে বিক্ষিপ্তভাবে। সঙ্গে হতে পারে বজ্রঝড় আর শিলাবৃষ্টি।
টানা ১৬ দিনের দাবদাহের পর আসছে ভারী বর্ষণ। একই সঙ্গে কবে থেকে বৃষ্টি শুরু হতে পারে সেটিও জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। আজ মঙ্গলবার থেকে দেশের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে রবিবার (২৩ এপ্রিল) থেকে সারাদেশে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিসহ হাওড় অঞ্চলে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মোঃ আজিজুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ৪ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে বেড়েছে দেশের তাপমাত্রা। ঢাকায় ১৬ এপ্রিল গত ৫৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার আগের দিন চুয়াডাঙ্গায় রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এর আগে ২০১৪ সালের এপ্রিলেও চুয়াডাঙ্গায় এই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।
ঢাকায় ১৯৬৫ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর আগে ১৯৬০ সালে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠেছিল ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ১৯৭৫ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এই রেকর্ড এখনও ভাঙেনি।
তীব্র তাপপ্রবাহের কারণ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও আবহাওয়া বিজ্ঞানী ড. তৌহিদা রশিদ বলেন, এবারে তাপপ্রবাহ যদি খেয়াল করেন, দেখবেন লম্বা সময় ধরে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। এমন কিন্তু প্রতি বছর হয় না। হয়তো বিরতি দিয়ে দিয়ে হয়। গত দশ মাসে সারা পৃথিবীর তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। চলতি বছর ১ দশমিক ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। কাজেই এবারের তাপপ্রবাহের পেছনে যে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রভাব রয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরের (পেরুর কাছের অংশটিতে) পৃষ্ঠের তাপমাত্রার ওপর সারা পৃথিবীর আবহাওয়া নির্ভর করে। সেখানে তাপমাত্রা বেশি থাকলে আমরা তাকে এল নিনো (খ-হরহড়) বলি। আর তাপমাত্রা কম থাকলে বলা হয় লা নিনা। আমরা এখন এল নিনো ফেইজে ঢুকছি। আগামী জুন-জুলাই মাসে পুরোপুরি এই ফেইজে ঢুকে যাবো। এই অবস্থা কখনো তিন বছর, কখনো পাঁচ বছর কখনো আবার সাত বছর স্থায়ী হয়। অর্থাৎ ওইদিকে ঠাণ্ডা বেশি থাকলে এশিয়ার এই দিকে গরম বেশি থাকে। এই প্রক্রিয়াটা তিন থেকে সাত বছর ঘুরে ফিরে স্থায়ী হয়।
কোথায় কখন বৃষ্টিপাত হতে পারে : আবহাওয়াবিদ মোঃ ওমর ফারুক বলেন, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা আমরা পূর্বাভাসে বলছি। তবে এই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ইতিমধ্যে দক্ষিণা বাতাস জলীয় বাষ্প সহকারে বইতে শুরু করেছে। এজন্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী দুই-তিন দিনে এই প্রবণতা বাড়বে। ২১, ২২ এপ্রিলের দিকে দেশের বেশিভাগ স্থানে বৃষ্টিপাত হতে পারে। ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে এ সময় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম। এসব এলাকাসহ পুরো দেশেই বৃষ্টিপাত এবং কালবৈশাখী ঝড় হবে ২৩ এপ্রিল থেকে। তবে সেটা একটানা নয়।
আবহাওয়া বিজ্ঞানী তৌহিদা রশিদ বলেন, এল নিনোর প্রভাবে এবারের বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হতে পারে। তবে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শক্তিশালী কালবৈশাখী, বজ্রঝড় ও শিলাবৃষ্টি হতে পারে। আগামী ১৯, ২০ এপ্রিল থেকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, ১৯ ও ২০ তারিখের দিকে বিক্ষিপ্তভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ সিলেট বিভাগে ও ময়মনসিংহ বিভাগে কিছু কিছু জায়গায় হালকা বৃষ্টিপাত হতে পারে। ২২ এপ্রিলের দিকে তাপপ্রবাহ কমতে পারে। তবে একেবারে কেটে যাবে তা নয়। হয়তো ব্যাপ্তি ও মাত্রা কমবে। ৩৬, ৩৭ ডিগ্রিতে নেমে আসবে। ঢাকায়ও ধীরে ধীরে কমবে। তাপপ্রবাহ মাসের শেষার্ধেও থাকবে। তবে সেটা হয়তে মৃদু আকারে থাকবে। বৃষ্টিপাত হলেও সেটা একেবারে এখনই যাচ্ছে না।
বাড়তে পারে ভ্যাপসা গরম : তেঁতে ওঠা প্রকৃতি যতটা না কষ্ট দিয়েছে এরচেয়ে বেশি কষ্ট দিতে পারে ভ্যাপসা গরম। বাতাসের জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। আর জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়লে এবং সূর্য কিরণ থাকলে ভ্যাপসা গরম বাড়বে।
আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, ইতিমধ্যে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে ভ্যাপসা গরম শুরু হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিপাত হলে বা বৃষ্টিপাতের পর রোদ থাকলে ভ্যাপসা গরম আরও বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে কষ্টটা বাড়তে পারে।
তবে কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সময় সোমবার (১৭ এপ্রিল) সকাল ৯টা ৬ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্ট দেন। পোস্টে দেশের তিনটি বিভাগে বৃষ্টির আভাস দিয়ে বাকি পাঁচটি বিভাগে তাপপ্রবাহ বা দাবদাহের পরিস্থিতি একই রকম থাকার আভাস দেন তিনি।
পোস্টে পলাশ লিখেন, ‘শুভ সকাল বাংলাদেশের সবাইকে। ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মানুষদের জন্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার সুসংবাদ ও রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের বেশির ভাগ জেলাগুলোতে তাপপ্রবাহের অবস্থা অপরিবর্তিত থাকার দুঃসংবাদ।’
তিনি লিখেন, ‘আপনাদের হয়তো মনে আছে ১৪ এপ্রিলের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম যে, আগামী ১৭ ও ১৮ এপ্রিল বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোনো কোনো জেলায় দুর্বল কালবৈশাখী ঝড়সহ খুবই হালকা পরিমাণ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ‘বিশেষ করে নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা সর্বোচ্চ।’
দাবদাহের পরিস্থিতি নিয়ে পোস্টে বলা হয়, ‘রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের বেশির ভাগ জেলাগুলোর তাপপ্রবাহের অবস্থা অপরিবর্তিত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আজ ঢাকার তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, তবে আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে গরমের প্রভাব বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ১৮ এপ্রিল থেকে সারাদেশে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। ১৯ এপ্রিল থেকে ঢাকার তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে। ১৯-২০ এপ্রিলের দিকে দেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা অঞ্চলে বৃষ্টি হতে পারে। আর ২৩ এপ্রিল থেকে সিলেট সুনামগঞ্জসহ হাওড় এলাকায় ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মোঃ আজিজুর রহমান আরও বলেন, ২৩ এপ্রিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিলা, চাঁদপুর অঞ্চলের কোন কোন এলাকার ওপর দিয়ে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া বিরাজ করছে। তাই দীর্ঘ তাপদাহের পর আবার ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ঢাকা শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত যানবাহন, ঘরে ঘরে এয়ারকন্ডিশনিং-এর তাপ এবং নির্মাণকাজের ফলে সৃষ্ট তাপ অন্যতম প্রধান কারণ বলে তিনি মনে করেন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।