শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সীসাকে সোনায় রূপান্তরের স্বপ্ন মানব ইতিহাসে এক বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। মধ্যযুগীয় আলকেমিস্টরা তাঁদের কর্মশালায় এই অসম্ভব লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা তাঁদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তৎকালীন পরীক্ষাগুলো ব্যর্থ হওয়ার পেছনে ছিল মৌলিক বৈজ্ঞানিক কারণ। সীসা ও সোনার প্রোটন সংখ্যার পার্থক্য—সীসার ৮২ এবং সোনার ৭৯—রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই রূপান্তরকে অসম্ভব করে তোলে। মার্কিন বিজ্ঞানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Scientific American এই বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি নতুন আলোচনায় আসে। Large Hadron Collider বা LHC-এর সক্ষমতা দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট শর্তে সীসাকে সোনায় রূপান্তর করা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। যদিও এটি প্রচলিত অর্থে ধাতু তৈরির প্রক্রিয়া নয়, বরং উপ-পরমাণু স্তরে পরিবর্তন।
মে মাসের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, European Organization for Nuclear Research বা CERN-এর পদার্থবিদরা একটি পরীক্ষার সময় সীসা থেকে সোনা তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। তবে তা ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণে এবং ক্ষণস্থায়ী।
LHC-তে পরিচালিত পরীক্ষায় সীসার কণাগুলোকে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে একে অপরের কাছাকাছি আনা হয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরাসরি সংঘর্ষ না ঘটলেও তীব্র তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে সীসা নিউক্লিয়াস থেকে তিনটি প্রোটন নির্গত হয়। এই প্রক্রিয়াতেই তা সোনায় রূপান্তরিত হয়।
Scientific American ব্যাখ্যা করেছে, এইভাবে তৈরি সোনা স্থিতিশীল নয়। তা মাত্র এক মাইক্রোসেকেন্ডের জন্য স্থায়ী থাকে, তারপর ভেঙে যায়। ফলে ব্যবহারযোগ্য সোনা উৎপাদনের প্রশ্নই ওঠে না।
CERN-এর ALICE বা A Large Ion Collider Experiment এই পরিবর্তন সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেয়। গবেষকদের মতে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে LHC প্রায় ৮৬ বিলিয়ন সোনার নিউক্লিয়াস তৈরি করেছে।
সংখ্যাটি বড় শোনালেও বাস্তবে এর ভর অত্যন্ত সামান্য। হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ এক গ্রামের প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগের সমান। একটি বিয়ের আংটি তৈরির জন্য যে পরিমাণ সোনা প্রয়োজন, তার তুলনায় এটি ট্রিলিয়ন গুণ কম।
৭ মে ALICE ও CERN-সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের গবেষণা Physical Review Journals-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে পরীক্ষার ফলাফল এবং বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই পদ্ধতিতে দ্রুত ধনী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং এই পর্যবেক্ষণ তাঁদের Big Bang-পরবর্তী মহাবিশ্বের অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে নতুন তথ্য দিচ্ছে এবং LHC-এর কর্মক্ষমতা উন্নত করার পথ নির্দেশ করছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সীসাকে সোনায় রূপান্তরের বহু পুরোনো স্বপ্ন আজ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে ক্ষণিকের জন্য সত্যি হয়েছে। তবে তা শিল্প বা বাণিজ্যিক সম্ভাবনার চেয়ে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের অনুসন্ধানেই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


