আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হওয়ার জন্য গোপন ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া অবশ্যক। গোপনে ইবাদত বা নেক আমল হলো লোকচক্ষুর আড়ালে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিভৃতে সম্পন্ন করা নফল ও পুণ্যকর্ম, যা ইখলাস (বিশুদ্ধতা) বৃদ্ধি করে এবং কবুল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রাখে।

ইবাদত

Advertisement

গোপনে করা যায় এমন কিছু নেক আমল হলো—

রাতের ইবাদত : তাহাজ্জুদ নামাজ, গভীর রাতে কোরআন তিলাওয়াত বা কান্নাভরা হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা (ইস্তিগফার) চাওয়া।

গোপন দান : অভাবগ্রস্তকে গোপনে সহায়তা করা, যাতে বাঁ হাত জানলে ডান হাত না জানে।

নফল রোজা : পরিবার বা মানুষকে না জানিয়ে নফল রোজা রাখা।

অন্যের সাহায্য : গোপনে কারো বিপদ উদ্ধার করা, এতিম বা বিধবার দেখাশোনা করা।

জিকির-আজকার : লোকচক্ষুর আড়ালে আল্লাহর নাম স্মরণ করা।

কারো গোপন নেক আমল যখন বেড়ে যায়, তখন তিনি ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হতে পারেন।আর ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে ‘ইহসান’। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইহসান হচ্ছে তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; যদি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস রাখবে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০)

যার গোপন ইবাদত যত সুন্দর হয়, তার বাহ্যিক আমলগুলো তত পরিপাটি হয়। এ জন্য মহান আল্লাহ গোপন ইবাদত অত্যধিক পছন্দ করেন। তিনি বান্দাকে সঙ্গোপনে দোয়া করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনীতভাবে ও চুপে চুপে। নিশ্চয়ই তিনি সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৫)

বান্দা যখন আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন করে, তখন আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি ভীষণ রাগান্বিত হন। আর আল্লাহর রাগ ও ক্রোধকে ঠাণ্ডা করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হলো গোপন ইবাদত, বিশেষ করে গোপনে দান করা। আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে, তাদের জন্য উত্তম পারিতোষিক আছে তাদের রবের কাছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তান্বিত হবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৪)

বিভিন্ন ধরনের বিপদ-আপদে আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হলো গোপন আমল। কারণ গোপন আমলে ফজিলত বেশি এবং খুব তাড়াতাড়ি কবুল হয়। আর কবুলযোগ্য কোনো আমলের অসিলায় আল্লাহর কাছে দোয়া করলে যেকোনো বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যেমন আগের যুগের তিনজন ব্যক্তি পাহাড়ের গুহায় আটকা পড়েছিল, সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় তাদের ছিল না। অতঃপর তারা যখন তাদের নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, তখন আল্লাহ তাদের গুহা থেকে বের করে আনেন। (বুখারি, হাদিস : ২২১৫)

ইউনুস (আ.) মাছের পেটে অবরুদ্ধ হয়ে কায়মনো বাক্যে আল্লাহকে ডেকেছিলেন এবং তাঁর তাসবিহ পাঠ করেছিলেন। ফলে আল্লাহ তাঁকে মাছের অন্ধকার পেটের ভেতর থেকে মুক্তি দান করেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘যদি সে এই সময় আল্লাহর গুণগানকারী না হতো, তাহলে সে তার পেটে অবস্থান করত পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১৪৩-১৪৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নেক আমল গোপনে করতে পারে, সে যেন তাই করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৬০১৮)

ইমাম মাওয়ার্দি (রহ.)-এর গোপন আমল

ইমাম মাওয়ার্দির গোপন আমল সম্পর্কে একটি কাহিনি প্রসিদ্ধ আছে। তিনি তাফসির, ফিকহসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু জীবদ্দশায় সেসব গ্রন্থের কোনোটিই প্রকাশিত হয়নি। পরে তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে ডেকে এনে বললেন, ‘অমুক স্থানে যে বইগুলো রয়েছে সব আমার রচিত। যখন আমার মৃত্যু যন্ত্রণা উপস্থিত হবে, তখন তুমি তোমার হাতকে আমার হাতের মধ্যে রাখবে। এ সময় যদি আমি আমার হাত টেনে নিই, তাহলে তুমি বুঝবে যে আমার কিছুই আল্লাহর কাছে কবুল হয়নি। এ অবস্থায় তুমি রাতের আঁধারে আমার সব লেখনী দজলা নদীতে নিক্ষেপ করবে। আর যদি আমি আমার হাত প্রসারিত করি, তাহলে বুঝবে যে আমার লেখাগুলো আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে। আর আমি আমার খালেস নিয়তে কৃতকার্য হয়েছি। অতঃপর মৃত্যুকালে তিনি স্বীয় হাত প্রসারিত করে দিলেন। ফলে পরবর্তী সময়ে তাঁর সব লেখনী প্রকাশিত হলো।’ (অফিয়াতুল আইয়ান : ৩/২৮৩; তারিখু বাগদাদ : ১/৫৪; তাবাকাতুশ শাফেঈয়াহ : ৫/২৬৮)

আলী বিন হুসাইন (রহ.)-এর গোপন আমল

আলী (রা.)-এর পৌত্র আলী বিন হুসাইন (রহ.) বলতেন, ‘রাতের অন্ধকারে কৃত সাদাকা আল্লাহর ক্রোধ দূরীভূত করে।’ তাই রাতের আঁধারে তিনি দান-সদকার খাবার পিঠে বহন করে শহরের ফকির-মিসকিন ও বিধবাদের গৃহে পৌঁছে দিতেন; অথচ তারা জানতে পারত না কে তাদের এ খাদ্যসামগ্রী দিয়ে গেল। আর সবার অজান্তে যাতে এ কাজ করতে পারেন, সে জন্য তিনি কোনো খাদেম, দাস কিংবা অন্য কারোরই সহযোগিতা নিতেন না। এভাবে অনেক বছর যাবৎ তিনি গোপনে এ কাজ করে যান। কিন্তু ফকির ও বিধবারা জানতেই পারেনি যে কিভাবে তাদের কাছে এ খাদ্য আসে। অতঃপর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করলেন এবং তারা তাঁর পৃষ্ঠদেশে কালো দাগ দেখতে পেল; তারা বুঝতে পারল যে তিনি তাঁর পিঠে কিছু বহন করার ফলে এই দাগের সৃষ্টি হয়েছে। অতঃপর তাঁর মৃত্যুতে শহরে ওই গোপন দান বন্ধ হয়ে গেল। রাবি ইবনে আয়েশা বলেন, তাঁর মৃত্যুর পর শহরবাসী বলতে লাগল, আলী বিন হুসাইন মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা গোপন দান থেকে বঞ্চিত হইনি।

(হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৩/১৩৬; সিফাতুছ সাফওয়াহ : ২/৯৬; আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ : ৯/১১৪)

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.