বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সদস্য জুয়াইরিয়া ফেরদৌস জয়িতা যেন নামকে সার্থক করে তুলেছেন কর্ম দিয়ে। কেননা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া এখনো অনেকের চোখে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

Nari

Advertisement

তার ওপর যদি সেই পথের যাত্রী হন একজন নারী, তবে চ্যালেঞ্জের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে নিজের স্বপ্নকে সত্যি করার গল্পই লিখছেন উদীয়মান নারী ক্রিকেটার জয়িতা।

তিনি যেমন একজন উদীয়মান নারী ক্রিকেটার, যিনি দৃঢ়তা, সাহস আর পরিশ্রম দিয়ে হয়ে উঠছেন তারুণ্যের অনুপ্রেরণা।

শৈশব থেকেই জয়িতার স্বভাব ছিল একটু আলাদা। চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসতেন, নতুন কিছু করতে আগ্রহী ছিলেন। তার নামের সঙ্গে যেন তার ব্যক্তিত্বের অদ্ভুত মিল- জয়িতা, অর্থাৎ যিনি জয় করতে জানেন।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জয়ী হওয়ার এক অদম্য প্রত্যয় তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে আজকের অবস্থানে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে এক আলাপচারিতায় উঠে এসেছে জয়িতার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প। ঝিনাইদহে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জয়িতার জীবনের শুরুটা কিন্তু ক্রিকেট দিয়ে নয়।

বরং তার ক্রীড়াজীবনের প্রথম অধ্যায় ছিল হকি।

শুধু হকিতেই নয়, কাবাডি ও অ্যাথলেটিকসের থ্রো ইভেন্টেও তার ছিল দারুণ দক্ষতা। এমনকি এক দিনে তিনটি ভিন্ন খেলায় স্বর্ণপদক জয়ের বিরল খ্যাতিও গড়েছেন তিনি। ২০২৩ সালের যুব গেমসে শটপুট, হকি ও কাবাডিতে স্বর্ণ জিতে নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
তবে এত কিছু থাকার পরও ক্রিকেটের প্রতি তার টান ছিল অন্যরকম। সেই ভালোবাসাই তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে আসে ক্রিকেটের পথে।

জয়িতার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিবার, বিশেষ করে তার শিক্ষক মা। তার মা একজন ক্রীড়া শিক্ষক এবং নিজেও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই মেয়ের স্বপ্নকে বুঝতে পেরেছেন শুরু থেকেই। যখন আত্মীয়-স্বজন কিংবা সমাজের মানুষজন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মেয়ে হয়ে খেলাধুলা করে কী হবে?’ তখন মায়ের দৃঢ় অবস্থানই জয়িতার পথকে সহজ করেছে।

২০২০ সালে ঢাকায় এক হকি ইভেন্টে অংশ নিতে এসে জয়িতার জীবনে আসে বড় একটি মোড়। সেই সময় তার মা জানতে পারেন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) নারী ক্রিকেট ক্যাম্পের ট্রায়াল হবে।

মেয়ের আগ্রহের কথা মাথায় রেখে মা তাকে ট্রায়াল দিতে উৎসাহিত করেন। জয়িতাও সুযোগটা লুফে নেন।

প্রায় ২০০ জন প্রতিযোগীর মধ্যে জায়গা করে নেওয়া, এরপর ধাপে ধাপে ১০০ জনে টিকে যাওয়া সব মিলিয়ে শুরু হয় তার ক্রিকেট যাত্রা।

বিকেএসপির ক্যাম্পে কোচদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে নিজের দক্ষতা ঝালিয়ে নিতে থাকেন জয়িতা। তার খেলার ধরন, আগ্রহ এবং পরিশ্রম দেখে কোচরাও তাকে অনুপ্রাণিত করতে থাকেন। সেই অনুপ্রেরণাই তাকে আরও মনোযোগী করে তোলে। প্রথম ক্যাম্পের পর দ্বিতীয় ক্যাম্প, তারপর প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে প্রতিটি ধাপেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি।

প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়া এবং উইকেটকিপিংয়ে শীর্ষে থাকা তাকে এনে দেয় নতুন সুযোগ। সেখান থেকে ডাক পান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রাথমিক ক্যাম্পে, এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জায়গা করে নেন জাতীয় পর্যায়ে।

তবে তার এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। একসময় যারা তার খেলাধুলা নিয়ে সমালোচনা করতেন, আজ তারাই তার সাফল্যে গর্বিত। সামাজিক মাধ্যমে অভিনন্দন জানান, ফোন করে শুভেচ্ছা দেন। এই পরিবর্তন জয়িতাকে যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি তাকে আরো দায়িত্বশীল করে তোলে।

ক্রিকেটে নিজের অবস্থান তৈরি করতে গিয়ে তাকে ছাড়তে হয়েছে তার পুরনো ভালোবাসা হকি। জাতীয় দলের হয়ে খেলা, আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নেওয়া সবকিছুই পেছনে ফেলে নতুন করে শুরু করা সহজ ছিল না। তার কোচরাও চেয়েছিলেন তিনি যেন হকি না ছাড়েন। এখনো সুযোগ পেলেই তাকে ফিরে আসার কথা বলেন। কিন্তু জয়িতা তার হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে বেছে নিয়েছেন ক্রিকেটকেই।

ক্রিকেটে তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ব্যাটিং পজিশনে। শুরুতে তিনি তিন বা চার নম্বরে ব্যাট করতেন। কিন্তু কোচের পরামর্শে ওপেনিংয়ে নামা শুরু করেন। তার শক্তিশালী ব্যাটিং এবং পাওয়ার প্লে কাজে লাগানোর দক্ষতা তাকে একজন কার্যকর ওপেনারে পরিণত করেছে।

নেপালে টি-টোয়েন্টি অভিষেকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হলেও জয়িতা নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তার মতে, তিনি আরো ভালো করতে পারতেন। বড় ইনিংস খেলতে না পারার আক্ষেপ তাকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে এই অসন্তুষ্টিই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।

ওয়ানডে ফরম্যাটের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে গিয়ে তিনি নিজের খেলায় এনেছেন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। টি-টোয়েন্টির দ্রুতগতির ক্রিকেট থেকে বেরিয়ে এসে ওয়ানডেতে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করার জন্য ধৈর্য, ডিফেন্সিভ খেলা এবং গ্রাউন্ড শটের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

সামনে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ তার ক্যারিয়ারের জন্য একটি বড় সুযোগ। ব্যক্তিগতভাবে এটি তার প্রথম ওয়ানডে সিরিজ, আর তাই নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদটা আরও বেশি। তার লক্ষ্য দলের জয়ে অবদান রাখা এবং সুযোগ পেলে বড় ইনিংস খেলা।

ক্রিকেটের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী তিনি। খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে ভবিষ্যতে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার স্বপ্নও বুনছেন জয়িতা।

জয়িতা জানিয়েছেন, ক্রীড়া সাংবাদিকতা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে খেলোয়াড় হিসেবে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়। তাই ভবিষ্যতে ক্রিকেটার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি সুযোগ পেলে এই পেশাতে যুক্ত হবেন ।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

তার এই যাত্রা প্রমাণ করে সঠিক দিকনির্দেশনা, পরিবারের সমর্থন ও নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.