মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় ঘোড়ার ভূমিকা আধুনিক যন্ত্রপাতি বা অস্ত্রের চেয়েও অনেক প্রভাবশালী- এমনটি দাবি করেছেন ইতিহাসবিদ টিমোথি ওয়াইনগার্ড। তার মতে, ঘোড়া ও মানুষের অংশীদারত্ব, পথচলা এবং ঐক্য শুরু হয়েছিল কমপক্ষে ৫ হাজার ৫০০ বছর আগে। ইউরেশীয় অঞ্চলে ঘোড়ার ওপর প্রথম মানুষের চড়ে ওঠার ঘটনা থেকে শুরু হয়েছিল সেই যাত্রা। আর সেই পরিবর্তন পুরো মানব সভ্যতাকে বদলে দেয়।

প্রাচীন গল্পের মতো ছুটন্ত ঘোড়ার নিয়ন্ত্রণ আয়ত্ব করতে পেরে মানুষ দ্রুতগতি, অনেক দূরত্বে ভ্রমণ, শিকার ও যুদ্ধের কৌশল বদলে ফেলতে সক্ষম হয়। নতুন বসতি স্থাপন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিপণন আর সামরিক শক্তির কাঠামো পুরোপুরি পাল্টে যায় ঘোড়ার কারণেই।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘোড়া এমন কিছু জিনিসকেও সরাসরি প্রভাবিত করেছে যা আমরা আজ ঘটা করে ভাবি না -যেমন প্যান্ট।
ইতিহাসবিদদের মতে, মানুষ যখন প্রথম ঘোড়ায় চড়া শুরু করল, তখন তারা বুঝতে পারল যে টগা বা কিল্টের মতো ঢিলেঢালা বা খোলা ধরনের পোশাক পরে ঘোড়ায় বসা খুবই অস্বস্তিকর। তাই ঘোড়ায় আরোহন সহজ ও আরামদায়ক করার জন্য ধীরে ধীরে পায়ের দু’দিকে আলাদা অংশ থাকা পোশাক-অর্থাৎ প্যান্ট বা প্যান্টের মতো পোশাক পরা জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।
টগা ছিল প্রাচীন রোমানদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, যা এক টুকরো লম্বা কাপড় শরীরের চারপাশে পেঁচিয়ে পরা হতো এবং এতে পা ঢাকার জন্য আলাদা কোনো অংশ থাকত না। একইভাবে কিল্ট হলো স্কটল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, যা হাঁটুর কাছ পর্যন্ত লম্বা স্কার্টের মতো এবং সাধারণত পুরুষরাই এটি পরতেন, যেখানে পা দুটো আলাদা করে ঢাকার ব্যবস্থা নেই। এই দুই ধরনের পোশাক হাঁটা বা দৈনন্দিন কাজের জন্য মোটামুটি উপযোগী হলেও ঘোড়ায় আরোহনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসুবিধা তৈরি করত-চড়ার সময় কাপড় উল্টে যেত, ভারসাম্য রাখা কঠিন হতো এবং আরোহন অস্বস্তিকর হয়ে উঠত।
ফলে মানুষ যখন নিয়মিত ঘোড়ায় চলাচল ও যুদ্ধ শুরু করে, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে খোলা বা ঢিলেঢালা পোশাক আর যথেষ্ট নয়। এই বাস্তব প্রয়োজন থেকেই ধীরে ধীরে পায়ের দু’দিকে আলাদা অংশযুক্ত, আঁটসাঁট ও আরামদায়ক পোশাকের প্রচলন ঘটে। আর এটিই পরবর্তীতে প্যান্ট বা প্যান্টের মতো পোশাক হিসেবে মানব সভ্যতার স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে।
এদিকে আধুনিক বিনোদন শিল্পের-যেমন চলচ্চিত্র- এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গেও ঘোড়ার নাম জড়িয়ে আছে। ১৮৯০-এর দশকে ঘোড়ার দৌড় পরীক্ষা করতেই সৃষ্টি হয়েছিল সিরিজ ক্যামেরার পদ্ধতি, যা পরবর্তী সময়ে চলচিত্রের ভিত্তি তৈরি করে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
আরো বিস্ময়কর বিষয়-জীবাশ্মগত গবেষণা ও চিকিৎসায় ঘোড়ার অবদান। ডিপথেরিয়া ও টেটানাসের মতো প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে প্রথম জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরিতে ঘোড়ার রক্তরস ব্যবহার হয়েছিল। সেই টিকাই অনেক শিশু ও সৈনিকদের জীবন বাঁচিয়েছে। সুতরাং ঘোড়া শুধু ‘প্রাণীই’ ছিল না-এটি ছিল মানব সভ্যতার এক অনবদ্য সহযাত্রী, যেটি আমাদের সাংস্কৃতিক, সামরিক ও বৈজ্ঞানিক ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
সূত্র: সিবিসি নিউজ
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


