যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলার করার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানের পাল্টা হামলায় গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের অগণিত বিমান হামলায় পর্যুদস্ত হচ্ছে তেহরান। ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে জবাব দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইরান আসলে কতদিন এভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। কারণ, ইতোমধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের কয়েকজন নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সুগঠিত শাসনব্যবস্থাই দেশটিকে যুদ্ধে টিকিয়ে রাখবে। কারণ, দেশটির প্রশাসনিক গঠন এমনভাবে সাজানো, যেখানো কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাবলয় নেই। প্রতিটি স্তরেই ক্ষমতার ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্র সক্রিয়। গতকাল রোববার কনভারসেশনের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চান। কিন্তু ইরানের শাসনব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকে। এই অবস্থায় শুরু হওয়া যুদ্ধ সহজেই থামবে না। বিশ্ব একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মুখোমুখি হতে পারে।
মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলা আবারও গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধে নিমজ্জিত করেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু বলেছেন, তাদের লক্ষ্য ইরানে একটি অনুকূল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনা।
তবে এ কথা সত্য, খামেনি হত্যাকাণ্ড ইসলামী শাসনব্যবস্থার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য আঘাত, তবুও এটি অপ্রতিরোধ্য নয়। অতীতে অনেক ইরানি নেতা নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থপতি কাসেম সোলাইমানির মতো জাঁদরেল নেতাও রয়েছেন। সোলাইমানিকে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে হত্যা করেছিলেন এই ট্রাম্পই। কিন্তু তাদের প্রতিস্থাপন তুলনামূলকভাবে সহজেই সম্পন্ন হয়েছিল। এ কারণেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে বছরের পর বছর।
খামেনির বিদায়ের মানে এই নয়, ইসলামী শাসনব্যবস্থার শিগগির অবসান ঘটবে। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে খামেনি আগেই সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি কারা হবে, তা তিনি স্পষ্ট করে গেছেন।
তেহরানের টেকসই শাসনব্যবস্থা
ইরানের সাংবিধানিক বিধানের অধীনে বিশেষজ্ঞ পরিষদ রয়েছে। সেখানে একজন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করা হয়। এই সর্বোচ্চ নেতার হাতেই সব ক্ষমতা নিহিত। খামেনি নিহত হওয়ায় এখন পরিষদ নিজস্ব পদমর্যাদার মধ্য থেকে অথবা বাইরে থেকে একজন অন্তর্বর্তীকালীন বা দীর্ঘমেয়াদি নেতা নিয়োগ করবে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব পড়বে ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমের সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচিত সংস্থা ‘অ্যাসেমব্লি অব এক্সপার্টস’-এর ওপর।
ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য যা যা করা দরকার, সব ব্যবস্থাই রয়েছে। দেশজুড়ে রয়েছে সেনাবাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এই বাহিনীর অধীন রয়েছে আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ। তারাও যে কোনো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করতে এবং শাসনের স্থায়িত্বের জন্য লড়াই করতে পারে। এসব বাহিনীর সদস্যদের ভাগ্য শাসনতন্ত্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ইরানি সরকারের বিভিন্ন প্রশাসক এবং আমলাদের পাশাপাশি সাধারণ ইরানিদের মধ্যেও শাসনের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিরা রয়েছেন।
গণবিক্ষোভের অপেক্ষায় ট্রাম্প
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানি জনগণকে দেশটির শাসনতন্ত্রকে উৎখাত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের টার্গেট দেশটির ৩০ বছরের কম বয়সী নাগরিক, যারা চলতি বছরের শুরুতে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরানি নাগরিকদের একটি অংশ শাসনব্যবস্থায় ক্ষুব্ধ। তারাই ওই বিক্ষোভে নেমেছিল। কিন্তু সরকার কঠোর হাতে তাদের দমন করে। বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহতও হয়।
খামেনি নিহত হওয়ার পর সেই বিক্ষোভ কি আবার দেখা দেবে– এমন প্রশ্ন উঠেছে। কোনো পক্ষ আবারও বিদ্রোহ শুরু করতে পারে– সেই অপেক্ষায় রয়েছে পশ্চিমা শক্তি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এমন কোনো শঙ্কা নেই। বরং দেশটির জনগণ সরকারকেই দৃঢ় সমর্থন দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ
ইরান সরকার বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয়েছে। তারা ইতোমধ্যেই পারস্য উপসাগরজুড়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ড্রোন ব্যবহার করেও পাল্টা আঘাত করছে তেহরান। কিছু কিছু স্থানে শত্রুপক্ষের সম্পদ ও স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে, আইআরজিসি হরমুজ প্রণালি আটকে দিয়েছে। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী সংকীর্ণ কৌশলগত জলপথ এই প্রণালিটি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও ২৫ শতাংশ তরল গ্যাস প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে বিভিন্ন দেশে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালি দখল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চীন-রাশিয়া ইরানের পক্ষে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানে হামলা ইতোমধ্যে বিশ্বকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে চীন, রাশিয়াসহ ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি আছে এমন অনেক দেশ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও জরুরিভাবে উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মনে করেছিল, কেবল পারমাণবিক কর্মসূচিই নয়, বরং ইরানের সামরিক সক্ষমতাও ধ্বংস করার জন্য এখনই সেরা সময়। কিন্তু সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে। কারণ, ইরানও দীর্ঘ সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


