দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে মুখর। রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনায় কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আসবে, তার রূপরেখা তুলে ধরতে ইশতেহার প্রকাশ করেছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে এমন ধারণাই প্রবল। দু’দলই তাদের ইশতেহারে খেলাধুলাকে গুরুত্ব দিয়ে আলাদা করে জায়গা রেখেছে।

গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। সেখানে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যেই স্থান পেয়েছে ক্রীড়াঙ্গনের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী তাদের ৯০ পৃষ্ঠার ইশতেহারে যুব ও ক্রীড়া অধ্যায়কে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে ক্রীড়া উন্নয়নের পরিকল্পনা, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য ও নারী ক্রীড়াবিদদের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
বিএনপির ইশতেহারে খেলাধুলাকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জাতীয় শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস কর্মসূচি’র মাধ্যমে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতিভাবান ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দেশজুড়ে ক্রীড়া অবকাঠামো বিস্তারে ৪৫০টি উপজেলায় মানসম্পন্ন ইনডোর স্টেডিয়াম এবং ৬৪ জেলায় ইনডোর সুবিধাসহ স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া দেশের সব উপজেলায় ক্রীড়া অফিসার ও ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে বিষয়ভিত্তিক ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে। বিভাগীয় শহরগুলোতে বিকেএসপির শাখা প্রতিষ্ঠা, মহানগর ও গ্রামীণ জনপদে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি দেশে ক্রীড়া সরঞ্জাম শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
বিএনপির পূর্ণাঙ্গ ইশতেহারে খেলাধুলা উন্নয়নে মোট ১০টি আলাদা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা শহরে ওয়ার্ড বা থানা-ভিত্তিক খেলার মাঠ তৈরি ও বেদখল হওয়া মাঠ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে ২০৩০ সালের মধ্যে সাউথ এশিয়ান গেমস, এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস ও অলিম্পিকের মতো ইভেন্টে সম্মানজনক সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে একটি আধুনিক জাতীয় অলিম্পিক একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ স্কিম চালু, আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদদের জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত করা, নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা ও হয়রানি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্রীড়াঙ্গনে দলীয় হস্তক্ষেপ বন্ধের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি। ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি হকি, বাস্কেটবল, ভলিবল, দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় পেশাদার লিগ চালুর পরিকল্পনার কথাও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।
বিএনপির পরিকল্পনায় রয়েছে একটি জাতীয় স্পোর্টস রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, স্পোর্টস ইকোনমি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’কে গুরুত্ব দেয়া। আগামী পাঁচ বছরে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে ৫০০ আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরির লক্ষ্যও ঘোষণা করেছে দলটি। পাশাপাশি কাবাডি, কুস্তি ও নৌকাবাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়নের অঙ্গীকার রয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারের সপ্তম ভাগে যুব ও ক্রীড়া অধ্যায়ে ১০টি পয়েন্টে ক্রীড়াঙ্গন এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। তারা ক্রীড়াকে শিশু-কিশোর ও যুবসমাজের সর্বজনীন অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার কথা বলেছে, যাতে সুস্থ-সবল জাতি গড়ে ওঠে।
জামায়াতের ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরে যোগ্যতার ভিত্তিতে ৫০০ আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের মাসিক বৃত্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে সহায়তা এবং স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে স্পন্সরশিপ সংগ্রহের কথাও বলা হয়েছে।
তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বনির্ভরতার অংশ হিসেবে ক্রীড়াক্ষেত্রেও ‘যোগ্যরাই সুযোগ পাবে’—এই নীতির প্রয়োগের কথা জানিয়েছে জামায়াত। সুস্থ যুবসমাজ গড়ে তুলতে মহল্লাভিত্তিক ব্যায়ামাগার, খেলার মাঠ ও সুইমিং পুল নির্মাণে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। অলিম্পিকসহ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টে সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
জামায়াত ক্রীড়াঙ্গনকে সিন্ডিকেট ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি হা-ডু-ডু, কুস্তি ও নৌকাবাইচের মতো দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করেছে দলটি। ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও ক্যানসার সচেতনতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি ও জামায়াত দু’দলই ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত, পেশাদার ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় খাতে রূপ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাস্তবায়নের দায়ভার এখন ভোটের রায়ের অপেক্ষায়।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


