বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার চূড়ান্তভাবে এক শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন মোট শুল্কের হার দাঁড়াচ্ছে ৩৪ শতাংশ।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে, অর্থাৎ এসব পণ্যে শুল্ক হার শূন্য থাকবে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষ থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই চুক্তিতে সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে স্বাক্ষর করেন দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান এবং সহকারী মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ। চুক্তির আনুষ্ঠানিক মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে।
এই উপলক্ষে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি বাংলাদেশি আলোচক দল বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থান করছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার আলোচনার সামগ্রিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের আলোচক দলের ‘অসাধারণ প্রচেষ্টা’র কথাও উল্লেখ করেন। গ্রিয়ার বলেন, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
চুক্তি শেষে বক্তব্যে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এই সমঝোতা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে একটি নতুন ঐতিহাসিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এর ফলে উভয় দেশই একে অপরের বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার পাবে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বাংলাদেশের প্রধান আলোচক ড. খলিলুর রহমান বলেন, পারস্পরিক শুল্ক হ্রাস বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত নির্দিষ্ট টেক্সটাইল ও পোশাকপণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেশের পোশাক খাতে নতুন গতি আনবে।
চুক্তিটি সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন লাভ করেছে। উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফিকেশন জারি করার পর এটি কার্যকর হবে।
তবে চুক্তির সব শর্ত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। কারণ এর আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষরিত হয়, যার আওতায় চুক্তির বিস্তারিত বিষয় গোপন রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু হয় গত বছরের এপ্রিলে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যেখানে বাংলাদেশের জন্য হার নির্ধারিত হয় ৩৭ শতাংশ। পরে এই শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।
তিন মাস পর, ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর শুল্ক হার ৩৭ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এ সময়ের মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৩ জুন একটি এনডিএ স্বাক্ষরিত হয়।
ওয়াশিংটনে আলোচনার পর গত বছরের ২ আগস্ট পাল্টা শুল্কের হার ২০ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। সর্বশেষ চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এই হার আরও এক শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, চুক্তিতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, উৎসবিধি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা, তুলাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ ও এর যন্ত্রাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


