ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি গৃহশিক্ষিকার ফ্ল্যাট থেকে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা এক ছাত্রী ও তার মায়ের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় গৃহশিক্ষিকা ও তার বড় বোনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহতরা হলেন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জোবাইদা রহমান ওরফে ফাতেমা (১৪) এবং তার মা রোকেয়া রহমান (৩২)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম (২৪) ও তার বড় বোন নুরজাহান বেগম (৩০)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগ এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটি গৃহশিক্ষিকা মীম বেগমের পরিবারের বসবাসের স্থান। উদ্ধারকৃত মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় মীম বেগমের শোবার ঘরের খাটের নিচ থেকে কর্কশিট দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় রোকেয়া রহমানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পুরো ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে বাথরুমের ফলস ছাদ থেকে তার কন্যা ফাতেমার অর্ধগলিত লাশ পাওয়া যায়।
নিহত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ফাতেমা প্রাইভেট পড়ার উদ্দেশ্যে মীম বেগমের বাসায় যায়। প্রাইভেট শেষ করে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে সে বাসা থেকে বের হয় বলে জানানো হয়েছিল। একই সময়ের কাছাকাছি ফাতেমার মা রোকেয়া রহমানও নিজ বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। এরপর থেকেই মা-মেয়ের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
এ ঘটনায় পরদিন ২৬ ডিসেম্বর রোকেয়ার স্বামী শাহীন আহমেদ কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে ৬ জানুয়ারি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দায়ের করেন।
এদিকে কয়েক দিন ধরে মুক্তিরবাগ এলাকায় মৃত প্রাণীর তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দুর্গন্ধ অসহনীয় হয়ে উঠলে বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় বাসিন্দারা উৎস অনুসন্ধানে বের হন। এক পর্যায়ে তারা মীম বেগমের ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেও মীম তাতে সম্মত হননি। পরে এলাকাবাসী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায়।
নিহত রোকেয়ার ভাই জাহিদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, শুরু থেকেই তারা গৃহশিক্ষিকা মীমকে সন্দেহ করছিলেন এবং বিষয়টি একাধিকবার পুলিশকে জানানো হয়েছিল। তার দাবি, নিহত মা ও মেয়ের গলায় সোনার চেইন ছিল, যা লুটের উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম জানান, নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হওয়ার পর মীম বেগমকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তখন তিনি দাবি করেন, ফাতেমা প্রাইভেট শেষে বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে সেই তথ্যের আংশিক মিল পাওয়া গিয়েছিল।
তবে দুই মরদেহ উদ্ধারের পর গ্রেপ্তারকৃত মীম ও তার বোন নুরজাহান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তে জানা যায়, মীমের স্বামী মো. হুমায়ুন বেপারী ও তাদের চার বছরের সন্তান এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাদের সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শুক্রবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম পিপিএম জানান, আগের অপহরণ মামলার ধারায় সংশোধন এনে এটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়েছে এবং মীম ও তার বোন নুরজাহানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
নিহত রোকেয়ার স্বামী শাহিন আহমেদ বলেন, তার মেয়ে ফাতেমা স্থানীয় সততা স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করে কালিন্দী গার্লস স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেই স্কুলেরই শিক্ষিকা মীমের কাছে প্রাইভেট পড়াতে দিয়েছিলেন তিনি। “প্রাইভেট পড়াতে দিয়েই আমি আমার স্ত্রী ও সন্তান—দুজনকেই হারালাম। আমি এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই,”—বলেন তিনি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


