পবিত্র রমজান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ইবাদাতে ব্যস্ত থাকেন। এ সময় ভোরে খাবার খেয়ে রোজা থাকা হয় এবং দিনভর ইবাদাতের পর সন্ধ্যায় ইফতার করা হয়। ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত গ্রহণ করা খাবারগুলো স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর হওয়া জরুরি। রমজান সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাসহ সবকিছুর চর্চার সুযোগ এনে দেয়। তবে ভুল খাদ্যাভ্যাস ও অনিয়মের কারণে অনেকেই রোজার সময় অসুস্থতা, ক্লান্তি বা হজমজনিত নানা সমস্যায় ভোগেন।

রমজানে সুস্থতা বজায় রাখার জন্য নিজেকেই সতর্ক থাকতে হবে। এ সময় খাদ্যতালিকা কেমন হবে, এ ব্যাপারে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন রাজধানীর মিরপুরের নিউট্রিলার্নবিডির নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েট কনসাল্টেন্ট পুষ্টিবিদ রোকসানা তনু।
এ পুষ্টিবিদ জানিয়েছেন, রমজানে অনেকের মধ্যে কিছু সাধারণ সাধারণ অভিযোগ দেখা যায়। এসব হলো- ইফতারের পর অতিরিক্ত ক্লান্তি, তারাবির নামাজে অনীহা, ইফতারের পর অ্যাসিডিটি বা বদহজম বৃদ্ধি, সারাদিন দুর্বল অনুভব করা, বিশেষ করে সাহরি বাদ দিলে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়া বা দ্রুত ওজন কমাতে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
পুষ্টিবিদ রোকসানা বলেন, রোজা আমাদের সংযম শেখায়। শারীরিক, মানসিক সবধরনের সংযম রাখা হয়। কিন্তু ইফতারের পর খাবারের পসরা বসানো হয়। অনেকেই অতিরিক্ত খাবার খেয়ে থাকেন। যা ঠিক নয়। দিনভর না খেয়ে থাকার পর ইফতারে সঠিক খাবার নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ।
ইফতারে সঠিক খাবার নির্বাচন কেন জরুরি:
পুষ্টিবিদের মতে, সারাদিন রোজা রাখার পর অনেকেই চিনির শরবত খাওয়ার পরপরই ভাজাপোড়া, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ ইত্যাদি খেতে শুরু করেন। এসব খাবারে অতিরিক্ত তেল ও ক্যালোরি থাকায় অ্যাসিডিটি, বদহজম এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। এ জন্য ইফতারে সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নেয়া জরুরি।
স্বাস্থ্যকর ইফতারের কিছু পরামর্শ:
ইফতারের অন্যতম প্রধান উপাদান শরবত। এতে বিভিন্ন ধরনের শরবত রাখা যেতে পারে। যেমন- ইসবগুলের ভূসি, তোকমা, চিয়াসিড (সকালে ভিজিয়ে রেখে), পিংকসল্ট ওয়াটার, ডাবের পানি, বেলের শরবত ও লেবু পানি। হাতের কাছে পুদিনা পাতা থাকলে পুদিনা পাতাও ব্যবহার করতে পারেন। এতে শরবতের সুন্দর ফ্লেভার আসবে।
অনেকেই ইফতারে ফলের জুস রাখেন। এ ক্ষেত্রে জুস না রেখে আস্ত ফল চিবিয়ে খাওয়া ভালো। বিভিন্ন কালারফুল ফল রাখতে পারেন। আর খেজুর রাখা তো স্বাভাবিক। ইফতারে চাইলে প্রথমেই একটি খেজুর খেতে পারেন। শরীরকে যথাসম্ভব হাইড্রেট রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, শরীর যেন পানিশূন্য না হয়। এ জন্য পছন্দমত হেলদি পানীয় দিয়ে ইফতারে বৈচিত্র্য আনুন।
এছাড়া টকদই, লাল চিড়া বা ওটস ও ফল একসঙ্গে খেলে পুষ্টি ও শক্তি পাওয়া যায়। সিদ্ধ বা রান্না ছোলা, টমেটো, গাজর, শসা, পেঁয়াজ, ডিম দিয়ে খেতে পারেন। এতে প্রোটিন, ফ্যাট ও ফাইবারের ভারসাম্য থাকে। চাইলে লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি, সবজি, মাছ, মাংস বা ডিমও রাখা যেতে পারে। মাঝে মাঝে সবজি খিচুড়িও ভালো বিকল্প।
চিনিযুক্ত শরবত, অতিরিক্ত মিষ্টি বা জিলাপি জাতীয় খাবার দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে শরীরে। এসব পরিমিত পরিমাণ খেতে হবে। কেননা, এসব দ্রুত ব্লাড সুগার বাড়ায়, একইসঙ্গে ব্লাড সুগার কমায়ও। ফলে তারাবির সময় খুব ক্লান্ত বোধ হয়।
রাতের খাবার কেমন হওয়া উচিত:
পুষ্টিবিদ রোকসানা জানিয়েছেন, ইফতারে তুলনামূলক ভারী খাবার খাওয়া হলে রাতের খাবার হালকা রাখা ভালো। স্যুপ, দুধ, বাদাম, ডিম বা সালাদ উপযোগী। সালাদে শসা, গাজর, বিট, টমেটো, ক্যাপসিকাম বা কাঁচা পেঁপে রাখা যেতে পারে। সঙ্গে সামান্য অলিভ অয়েল মেশাতে পারেন।
সাহরি বাদ দেয়া কি ঠিক:
পুষ্টিবিদ বলেন, রমজানে ওজন কমানোর জন্য সাহরি এড়িয়ে যাওয়া একটি ভ্রান্ত ধারণা। যদিও এটি ক্যালোরির ঘাটতি তৈরির একটি উপায় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই খাবার এড়িয়ে যাওয়ার ফলে প্রায়ই ক্লান্তি, দুর্বলতা, পানিশূন্যতা এবং ইফতারের সময় অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। যা শেষ পর্যন্ত ওজন কমানোর লক্ষ্যকে ব্যাহত করে।
সাহরিতে অতিরিক্ত মশলা, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। লাল চালের ভাত, ডাল, সবজি, লাল আটার রুটি, মাছ, ডিম, দুধ, সালাদ ইত্যাদি খেতে পারেন। প্রতিদিন ভাত না রেখে একদিন দই চিড়া বা ওটসও বাখতে পারেন। অনেকে হালকা রাখতে চান এই সময়ের খাবার। তারা ডিম, দুধ, বাদাম, কলা রাখতে পারেন। খাবারের শেষে একটি খেজুর খেতে পারেন। এ সময় শুকনো ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া ঠিক নয়। চা বা কফি পান থেকে বিরত থাকুন। এগুলো পানিশূন্যতা বাড়ায়।
সবশেষ এ পুষ্টিবিদ জানিয়েছেন, রমজানে শুধু খাবারে সংযম থাকা যাবে না। এ সময় সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ ও নিয়মিত হালকা ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ থাকাও লক্ষ্য হওয়া উচিত। নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে সচেতন থাকতে হবে, তবেই রোজা হবে আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যকর। আর কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যায় কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


