আমাদের রান্নাঘরের দৈনন্দিন জীবনে তেল অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু কোন তেল কতটা, কীভাবে এবং কার জন্য উপকারী, এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো যায়। আধুনিক জীবনে হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস, স্থূলতা ও হরমোনজনিত নানা সমস্যার সঙ্গে খাদ্যতেলের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই সুস্থ থাকতে রান্নার তেল ও ঘি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত ধারণা থাকা জরুরি।

তেল খাবারের স্বাদ বাড়ায়, শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির প্রধান উৎসও। কোষের গঠন ও স্থায়িত্ব বজায় রাখে। হরমোন তৈরিতে ভূমিকাও রাখে। ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোর শোষণেও তেল অপরিহার্য। তাই আমাদের এমন তেল নির্বাচন করতে হবে, যেখানে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের ভারসাম্য বজায় থাকে। রাইস ব্রান, সরিষা ও অলিভ অয়েল এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প। এগুলো হৃদযন্ত্রের জন্য নিরাপদ এবং শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।
রান্নার সময় তেলের স্মোক পয়েন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেল অতিরিক্ত গরম হলে এর ফ্যাটি অ্যাসিড ভেঙে গিয়ে ট্রান্স ফ্যাট ও ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরি হয়, যা কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং কোষের ক্ষতি করে। তাই বেশি তাপে রান্নার ক্ষেত্রে অবশ্যই উচ্চ স্মোক পয়েন্টের তেল ব্যবহার করা উচিত।
বিভিন্ন তেলের পুষ্টিগুণ বিবেচনা করলে দেখা যায়, অলিভ অয়েল হালকা ভাজা, গ্রিল বা সালাদের জন্য উপযোগী এবং হৃদ?স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল বেশি তাপে ব্যবহার করা ঠিক নয়। সে ক্ষেত্রে লাইট অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যায়। সরিষার তেল বাঙালি রান্নার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটে সমৃদ্ধ এবং ভাজা, ঝাল বা ভর্তা- সব ধরনের রান্নাতেই মানানসই।
সানফ্লাওয়ার অয়েল তুলনামূলক হালকা এবং এর স্মোক পয়েন্ট বেশি হওয়ায় ডিপ ফ্রাই, ফাস্ট ফুড কিংবা দৈনন্দিন রান্নার জন্য বেশ উপযোগী। রাইস ব্রান অয়েলের স্মোক পয়েন্ট খুব বেশি। ফলে ভাজাভাজির জন্য এটি আদর্শ এবং কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক। নারকেল তেল মাঝারি তাপে রান্না ও কারি জাতীয় খাবারের জন্য ভালো এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। সয়াবিন তেল পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটে সমৃদ্ধ এবং মাঝারি থেকে উচ্চ স্মোক পয়েন্ট থাকায় সাধারণ ভাজা রান্নায় ব্যবহার করা যায়। তবে এতে অতিরিক্ত ওমেগা-৬ থাকায় বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরে ইনফ্লেমেশন বাড়তে পারে। ঘি আলাদা গুরুত্বের দাবিদার। এতে থাকা বিউটারিক অ্যাসিড অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে, হজমশক্তি বাড়ায় এবং ইমিউন সিস্টেমকে সহায়তা করে। পাশাপাশি এর স্মোক পয়েন্টও তুলনামূলকভাবে বেশি। তেল বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন রান্নার জন্য সানফ্লাওয়ার বা রাইস ব্রান তেল ভালো, স্বাদের জন্য সরিষার তেল উপযুক্ত আর হালকা রান্না বা স্বাস্থ্যসচেতনদের জন্য অলিভ অয়েল কার্যকর।
কিছু সতর্কতা মনে রাখা জরুরি। একই তেল বারবার গরম করা উচিত নয়, ডিপ ফ্রাইয়ের পরিমাণ কমাতে হবে এবং এক ধরনের তেলের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন তেল পালাক্রমে ব্যবহার করা ভালো। ‘লো ফ্যাট’ খাবারের ধারণার চেয়ে ‘রাইট ফ্যাট’ বা সঠিক চর্বি বেছে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবশেষে বলা যায়, তেল কম খাওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি হলো, সঠিক তেল সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করা।
লেখক : ফারজানা ওয়াহাব
পুষ্টিবিদ, আলোক হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা
হটলাইন : ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


