ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে হয়েছে প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার। এর পাশাপাশি ব্রেন্ট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে হয়েছে ৯২ ডলার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত উচ্চ জ্বালানি মূল্যের মুখোমুখি হতে পারে। এমনকি যদি এক সপ্তাহের এই সংঘাত দ্রুত শেষও হয়ে যায়। কারণ এরই মধ্যে ইরান, কাতার, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের তেলক্ষেত্র বা রিফাইনারি আক্রান্ত হওয়া, সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও বিঘ্নিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা, ব্যাহত লজিস্টিকস এবং জাহাজ চলাচলের বাড়তি ঝুঁকির কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সম্প্রতি কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী এবং দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ এবং শিপিং রুটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তা ‘বিশ্বের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে’। সাদ আল-কাবি জানান, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত আগামী কয়েক সপ্তাহ চললে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে পৌঁছতে পারে। তিনি বলেন, ‘যদি এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে বিশ্বব্যাপী জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রত্যেকের জন্য জ্বালানি খরচ বেড়ে যাবে, পণ্যের ঘাটতি দেখা দেবে এবং কারখানাগুলো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় একটি চেইন রি-অ্যাকশন বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে।’
এক গবেষণা নোটে জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকরা বলেন, বাজার এখন কেবল ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিতে নেই, সেই সঙ্গে অপারেশনাল বিঘ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। কারণ রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রপ্তানি সীমাবদ্ধতা তেলের প্রক্রিয়াকরণ ও আঞ্চলিক সরবরাহ প্রবাহকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।
সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ স্থগিত হয়ে গেছে। কারণ তেহরান তার উপকূল ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালাচ্ছে।
যদিও সম্প্রতি ইরান ঘোষণা দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব জাহাজ চলাচল করতে পারবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ তাদের নিশানায় থাকবে। তবু এই পথে ঝুঁকি থেকেই যায়।
হরমুজ প্রণালি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের বড় তেল উৎপাদক দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও কুয়েত তাদের তেল পরিবহন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী রিফাইনারিগুলোর জন্য প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এই বিপুল তেল বৈশ্বিক চাহিদার ১.৪ দিনের সমান।
রিস্টাড এনার্জির আমেরিকা অঞ্চলের বাণিজ্যিক দলের প্রধান আমির জামান বলেন, শিপিং বিঘ্নের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক তেলক্ষেত্র বন্ধ হয়ে গেলে সেগুলোকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি তেলের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু যাতায়াত খরচ নয়, শিল্প উৎপাদন, খাদ্যদ্রব্য এবং আমদানি করা পণ্যের দামও ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। এ ছাড়া জ্বালানিসংকট এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সূত্র : রয়টার্স, ট্রেডিং ইকোনমিকস
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


