বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, বিশেষ করে ধান চাষের সঙ্গে। তবে কৃষিকাজে সময়মতো সেচ দেওয়া, সারের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ, বালাইনাশক প্রয়োগ এবং পোকামাকড় দমনসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় কৃষকদের। বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকেরা অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কার্যকর সমাধান থেকে বঞ্চিত হন। এসব সমস্যার সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমন্বিত একটি কৃষিভিত্তিক অ্যাপ তৈরি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।

অ্যাপটির নাম রাখা হয়েছে ‘বিডি ফার্মমেট-এআই (BDFarmMate-AI)’। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ‘ইমপ্রুভিং কম্পিউটার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং টারশিয়ারি এডুকেশন প্রজেক্ট’ শীর্ষক দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় এটি তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যান্ড্রয়েড ও ওয়েবভিত্তিক এআই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে কৃষি খাতে এমন কোনো সমন্বিত সফটওয়্যার বা প্ল্যাটফর্ম নেই যেখানে কৃষক, ব্যবসায়ী ও সেবা প্রদানকারীরা একসঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। ফলে কৃষকেরা সময়মতো প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা থেকে বঞ্চিত হন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষিকাজকে আরও সহজ, লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলছে, যার ফলে শিক্ষিত তরুণরাও কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণে আগ্রহী হচ্ছেন।
প্রকল্পের প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাকিব হাসান। সহযোগী গবেষক হিসেবে আছেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মেছবাহ উদ্দিন, কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বায়োসিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. হাক জিন কিম। প্রকল্পটি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গ্রান্ট (আরডিজি) দ্বারা অর্থায়িত। এটি ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।
অধ্যাপক ড. মো. রাকিব হাসান বলেন, তাদের লক্ষ্য একটি সমন্বিত সিস্টেম তৈরি করা, যেখানে কৃষকেরা সহজেই প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও সেবা পাবেন। এতে ফার্ম ব্যবস্থাপনা, বাজার পরিস্থিতি, আবহাওয়া, ফসলের রোগবালাই এবং সঠিক বালাইনাশকের তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ভালো মানের ধান উৎপাদন হলেও কৃষকেরা অনেক সময় সঠিক বাজার সংযোগ পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা সব কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে সরকারের নীতি ও ভর্তুকির সুফলও অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে এবং কৃষিখাতে তথ্যের ঘাটতি কমে আসবে।
অ্যাপটির বিভিন্ন ফিচারের মধ্যে থাকবে ‘প্যাডি ক্যালেন্ডার’, যা কৃষকদের সময়ভিত্তিক করণীয় সম্পর্কে সতর্ক বার্তা দেবে। কখন সেচ দিতে হবে, সার প্রয়োগ করতে হবে, ফসল কাটতে হবে কিংবা আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে—এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানাবে এআই সিস্টেম। এছাড়া ‘ফটো ডাক্তার’ নামে একটি ফিচারের মাধ্যমে কৃষকেরা ফসলের আক্রান্ত অংশের ছবি আপলোড করলে এআই প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও বালাইনাশকের তথ্য দেবে।
প্রকল্পের আওতায় সম্প্রতি ময়মনসিংহ অঞ্চলের ধানচাষিদের নিয়ে একটি উদ্বোধনী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে উপস্থিত ছিলেন বাকৃবির উপাচার্য (দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. জি এম মুজিবর রহমান, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথমেটিকস বিভাগের প্রধান মো. সাইদ ইফতেখার ইউসুফসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও স্থানীয় ধানচাষীরা।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



